‘যাদের বাঁচাতে পারিনি, তাদের জন্য ক্ষমা চাই’: ওরেগনের স্কুলে হামলাকারীকে গুলি করে থামানো বাবার আকুতি
যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যে নিজের দুই মেয়ের স্কুলে বন্দুক হামলাকারীকে গুলি করে হত্যা করা বাবা কায়লুব জিয়ামানকো বলেছেন, শিশুদের প্রাণের জন্য আকুতি তিনি এখনো কানে শুনতে পান। যাদের বাঁচাতে পারেননি, তাদের জন্য তাঁর অনুশোচনা ও ক্ষমা প্রার্থনার কথা তিনি খোলাখুলি জানিয়েছেন।
এ মাসের শুরুতে সিলভার রেল এলিমেন্টারি স্কুলে ১৬ বছর বয়সী এক সাবেক শিক্ষার্থী হামলা চালিয়ে তিন শিক্ষার্থী ও এক শিক্ষককে হত্যা করে। পরে অভিভাবক কায়লুব জিয়ামানকো হামলাকারীকে গুলি করে হত্যা করেন। ঘটনার পর থেকে তাঁকে ‘নায়ক’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদিও তিনি নিজে সেই পরিচয়ে সায় দিতে নারাজ।
শুক্রবার প্রচারিত ওরেগন পাবলিক ব্রডকাস্টিংকে (ওপিবি) দেওয়া সাক্ষাৎকারে জিয়ামানকো নিহত শিশুদের বাবা-মায়েদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি তাদের কাছে ক্ষমা চাইতে চাই—আমি তাদের সন্তানদের বাঁচাতে পারিনি।’ তিনি বলেন, ‘অনেকের সন্তানকে বাঁচানোর জন্য কৃতজ্ঞতা পাওয়াটা অসাধারণ, কিন্তু এমন অনেকে ছিল যাদের আমি বাঁচাতে পারিনি।’
৩৬ বছর বয়সী জিয়ামানকো বলেন, তিনি নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে চান, ‘তাদের সঙ্গে কাঁদতে এবং তাদের জড়িয়ে ধরতে’ চান। হামলাকারীর সঙ্গে লড়াই করা শিক্ষকের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ওই শিক্ষকই তাঁকে নিজের জীবন না হারিয়ে হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিয়েছেন। ‘আমি তাঁকে জড়িয়ে ধরতে চাই, কারণ তিনিই আসল নায়ক,’ বলেন তিনি।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহত তিন শিক্ষার্থীই ছেলে, তাদের বয়স পাঁচ, আট ও ১১ বছর। একটি শ্রেণিকক্ষে মোট ছয়জন গুলিবিদ্ধ হন; নিহত শিক্ষক ছাড়াও আরেকটি শিশু ও আরেকজন শিক্ষক আহত হন।
ওপিবিকে জিয়ামানকো জানান, হামলার দিনটি শুরু হয়েছিল স্বাভাবিকভাবে—নাশতা আর টিফিন গুছিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে। সেদিন ছিল স্কুলের ছবি তোলার দিন, তাই তিনি ও তাঁর স্ত্রী মেয়েদের তৈরি করতে বাড়তি সময় দিয়েছিলেন। পেশায় কাঠমিস্ত্রি জিয়ামানকো কাজে টিফিন নিয়ে গেলেও পরে সিদ্ধান্ত বদলে স্ত্রীর সঙ্গে দুপুরের খাবার খেতে বাড়ি ফেরেন—সেই সিদ্ধান্তই তাঁকে হামলা শুরুর মুহূর্তে স্কুলের পাশ দিয়ে নিয়ে যায়।
প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, লম্বা বন্দুক হাতে কেউ হয়তো ঠাট্টা করছে। এরপর তিনি দেখেন, ওই ব্যক্তি একটি পিকআপ ট্রাকে গুলি করে স্কুলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তখন তিনি নিজের গাড়ি থেকে হ্যান্ডগানটি বের করে জরুরি সেবায় ফোন করেন। তিনি বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, দুঃখিত, আমাকে ভেতরে যেতেই হবে। মানুষ মারা যাবে।’
হামলাকারী স্কুলের তালাবদ্ধ কাচের দরজায় গুলি করে ভেতরে ঢোকে। শিশুদের প্রাণভিক্ষা আর আরও গুলির শব্দ শুনে জিয়ামানকো হামাগুড়ি দিয়ে ভবনের দিকে এগিয়ে যান। তাঁর ভাষায়, ‘আমি নিজেকে বলেছিলাম, এটাই হয়তো আমার জীবনের শেষ কাজ হতে যাচ্ছে।’
ভাঙা জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে তিনি শ্রেণিকক্ষের কাছে পৌঁছান, যেখানে এক শিক্ষক হামলাকারীর সঙ্গে লড়ছিলেন। দরজা খুলে তিনি গুলি চালান। জিয়ামানকো জানান, হামলাকারী নিজের অস্ত্রের দিকে হাত বাড়ালে তিনি আবার গুলি করেন। এরপর একজন পুলিশ কর্মকর্তা এলে তিনি নিজের বন্দুকটি মাটিতে রেখে দুই হাত তুলে ধরেন।
তিনি নিজেকে শিশু ও বন্দুকধারীর মাঝখানে ‘শেষ প্রতিরক্ষা প্রাচীর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন এবং বলেছেন, সেদিন সেখানে থাকাটাই যেন তাঁর নিয়তি ছিল। ঘটনার পর তিনি স্ত্রীকে ফোন করে বলেন, দুপুরে তিনি বাড়ি ফিরছেন না এবং স্ত্রীকে দ্রুত স্কুলে আসতে হবে। এরপর তিনি মাকে ফোন করে বলেন, ‘মা, আমাকে এমন একজনের প্রাণ নিতে হয়েছে, যাকে আমার মনে হয় হয়তো একটি শিশু—কারণ সে আমার মেয়ের স্কুলে বন্দুক নিয়ে ঢুকেছিল।’
পুলিশ হামলাকারীর পরিচয় প্রকাশ করেছে—গ্রিফিন জে জন দ্বিতীয়, স্কুলটির সাবেক শিক্ষার্থী, যে বিশেষ শিক্ষা ক্লাসে পড়ত। তার উদ্দেশ্য এখনো তদন্তাধীন। বেন্ড পুলিশের প্রধান মাইক ক্রান্টজ বলেন, হামলাকারীর সঙ্গে লড়াই করা শিক্ষক তার ফোন ছুড়ে মেরে, তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে তার শটগান কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং তিনি ‘প্রায় নিশ্চিতভাবেই আরও রক্তপাত ঠেকিয়েছেন’।
সবচেয়ে ছোট নিহত শিশু রোয়াম সামার, বয়স পাঁচ বছর। তার বাবা বলেছেন, পরিবারটি ‘ভেঙে পড়েছে ও দিশেহারা’। নিহত শিক্ষক মেগান ল্যাম্বার্টের বয়স ২৫; পরিবারের ভাষায়, এটি ছিল তার ‘স্বপ্নের চাকরি’। ‘সে সবসময় পিছিয়ে থাকা ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্নদের পাশে দাঁড়াত,’ বলেছে পরিবার। বাকি দুই ছেলের নাম পরিবারের অনুরোধে প্রকাশ করা হয়নি। আহত শিক্ষকের নাম বেকি ড্রুরি, বয়স ৫৪; যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, শ্রেণিকক্ষের দরজা বন্ধ করার চেষ্টা করার সময় হামলাকারী তাকে গুলি করে।
গুলি চালনার এক দিনেরও কম সময়ের মধ্যে জিয়ামানকোর নাম প্রকাশ্যে আসে। তাঁর মা কেনডা ফ্রিম্যান পরিবারের পক্ষে বিবৃতি পড়ে জানান, তিনি কোনো স্বীকৃতি চান না এবং পরিবার গোপনীয়তা চায়। হামলার পরপরই ওরেগনের গভর্নর টিনা কোটেক তাঁর হস্তক্ষেপের প্রশংসা করে এর মানসিক বোঝার কথাও স্বীকার করেন। গভর্নর বলেন, ‘আপনার এই কাজের সঙ্গে ভারী মানসিক বোঝা জড়িয়ে আছে; আমি শুধু জানাতে চাই, আমার ভাবনা আপনার সঙ্গেও আছে।’
জিয়ামানকো ওপিবিকে জানান, এখন পরিবারের সবাই ঘুমিয়ে গেলে তিনি জেগে থাকেন আর সেই হামলার দৃশ্য বারবার মনে পড়ে। ‘আমি আবার বাঁচি সেই মুহূর্তগুলো, আমি মুখগুলো দেখি, কণ্ঠ শুনি, চিৎকার শুনি,’ বলেন তিনি। একটি স্কুল, এক বাবার সাহস আর অসংখ্য পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি—ওরেগনের এই ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রে স্কুলে বন্দুক সহিংসতার বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।






