অস্ত্রোপচার ছাড়াই হাঁটুর ব্যথায় দীর্ঘস্থায়ী স্বস্তি: ৮০ শতাংশ রোগীর উপকার নতুন গবেষণায়
অস্ত্রোপচার ছাড়া হাঁটুর অতিরিক্ত রক্তনালি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার একটি পদ্ধতি হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত রোগীদের দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা উপশম দিচ্ছে বলে নতুন এক গবেষণায় জানা গেছে। ক্লিনিক্যাল গবেষণায় অংশ নেওয়া ১৯৪ জন রোগীর মধ্যে ৮০ শতাংশই জানিয়েছেন, চিকিৎসার অন্তত এক বছর পরও তাঁদের হাঁটুর ব্যথা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে রয়েছে।
এই ফলাফল এমন লাখ লাখ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য বিকল্পের সম্ভাবনা তুলে ধরছে, যাঁদের দীর্ঘদিনের জয়েন্টের ব্যথায় ব্যথানাশক ওষুধ বা স্টেরয়েড ইনজেকশনে আর কাজ হচ্ছে না, অথচ তাঁরা পুরো হাঁটু প্রতিস্থাপনের মতো বড় অস্ত্রোপচার এড়াতে চান।
মেয়ো ক্লিনিকের বর্ণনা অনুযায়ী, অস্টিওআর্থ্রাইটিসে জয়েন্টের কার্টিলেজ ক্ষয়ে যায় এবং শরীর হাঁটুর চারপাশে অপ্রয়োজনীয় নতুন রক্তনালি তৈরি করে। এই অতিরিক্ত নালিগুলো প্রদাহ বাড়ায় এবং আশপাশের স্নায়ুকে উত্তেজিত করে, ফলে দৈনন্দিন নড়াচড়া যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে।
নতুন পদ্ধতিটির নাম জেনিকুলার আর্টারি এমবোলাইজেশন, সংক্ষেপে জিএই। এটি সরাসরি ওই সমস্যার ওপর কাজ করে। অতিরিক্ত রক্তনালি সাময়িকভাবে আটকে দিয়ে চিকিৎসকেরা বড় অস্ত্রোপচার বা স্থায়ী ইমপ্লান্ট ছাড়াই প্রদাহ কমাতে এবং ব্যথা অনুভবকারী স্নায়ুকে শান্ত করতে পারেন।
এই চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় অণুবীক্ষণিক জেলাটিন কণা, যা সময়ের সঙ্গে দ্রবীভূত হয়ে যায়। ফলে শরীরে কোনো বিদেশি উপাদান থেকে যায় না। গবেষকদের মতে, ব্যাপকভাবে চালু হলে জিএই রোগীদের জন্য পুনরাবৃত্তিযোগ্য ও কম ঝুঁকির একটি উপায় হতে পারে, যাতে তাঁরা সক্রিয় থাকতে পারেন এবং জয়েন্টের কার্যক্ষমতা আরও দীর্ঘদিন ধরে রাখতে পারেন।
বার্লিনের শারিতে-উনিভার্সিট্যাটসমেডিৎসিনের ইন্টারভেনশনাল রেডিওলজি ক্যাম্পাস মিটের উপপ্রধান ফ্লোরিয়ান নিমা ফ্লেকেনস্টাইন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘আজ হাঁটুর অস্টিওআর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত অনেক রোগীর জন্য সত্যিকারের চিকিৎসা-ঘাটতি রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের গবেষণা দেখিয়েছে, দ্রুত দ্রবীভূত জেলাটিন-ভিত্তিক মাইক্রোস্ফিয়ার ব্যবহার করে জিএই একটি নিরাপদ, ন্যূনতম আক্রমণাত্মক চিকিৎসা, যা অস্টিওআর্থ্রাইটিসজনিত হাঁটুর উপসর্গে অন্তত ১২ মাস অর্থবহ ব্যথা উপশম ও কার্যক্ষমতার উন্নতি দেয়।’
প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে চিকিৎসকেরা রিয়েল-টাইম এক্স-রে নির্দেশনায় একটি পাতলা, নমনীয় নল হাঁটুর জয়েন্টের চারপাশের রক্তনালিতে পৌঁছে দেন। এরপর প্রদাহযুক্ত এলাকায় অতিরিক্ত রক্তপ্রবাহ ধীর করতে নির্দিষ্ট নালিগুলোতে ক্ষুদ্র, দ্রবণীয় জেলাটিন কণা ছাড়া হয়।
গবেষণায় ১৯৪ জন অংশগ্রহণকারীর ওপর মোট ২৩৯টি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে, এবং কারও ক্ষেত্রেই গুরুতর জটিলতা দেখা যায়নি। মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ রোগী হালকা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা জানিয়েছেন — যেমন সাময়িক ত্বকের রঙ বদলে যাওয়া বা সামান্য কালশিটে — যেগুলো নিজে থেকেই সেরে গেছে।
ফ্লেকেনস্টাইন বলেন, ‘আমাদের দলে আমরা ব্যথার উল্লেখযোগ্য হ্রাস এবং খেলাধুলা, বিনোদন ও দৈনন্দিন কাজসহ কার্যক্ষমতার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি দেখেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তাঁদের জীবনযাত্রার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।’
ব্যথা কমার পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীরা দৈনন্দিন চলাফেরায়ও উন্নতির কথা জানিয়েছেন। হাঁটা, সিঁড়ি ওঠা ও হাঁটু ভাঁজ করা সহজ হয়েছে বলে তাঁরা জানান, আর ১২ মাসের ফলো-আপ সময়ে সামগ্রিক জীবনমান স্কোর দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।
তবে গবেষকেরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, গবেষণায় এমন কোনো নিয়ন্ত্রণ দল ছিল না, যারা ছদ্ম বা প্লাসিবো প্রক্রিয়া পেয়েছে। তুলনামূলক দল ছাড়া দ্রবণীয় কণার শারীরিক উপকারকে সম্ভাব্য প্লাসিবো প্রভাব থেকে আলাদা করা কঠিন বলে তাঁরা জানিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত, গবেষণায় রোগীদের মাত্র এক বছর পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ব্যথার স্বস্তি সাধারণত কতদিন থাকে এবং কতবার পুনরায় চিকিৎসা লাগতে পারে, তা জানতে আরও গবেষণা দরকার। সবশেষে, জিএই প্রদাহ ও ব্যথা কমালেও এটি রোগের নিরাময় নয় — এটি হারানো কার্টিলেজ পুনর্গঠন করে না বা জয়েন্টের কাঠামোগত ক্ষতি উল্টে দেয় না। এই প্রাথমিক ফল নিশ্চিত করতে বড় আকারের র্যান্ডমাইজড ট্রায়াল বর্তমানে চলমান রয়েছে।






