ট্যাংকারে হামলার পর তেল ছড়িয়ে পড়ল আমিরাতের সৈকতে, হুমকিতে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য
হরমুজ প্রণালীর কাছে হামলার শিকার একটি ট্যাংকার থেকে ছড়িয়ে পড়া তেল সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে কিছু সৈকত ও উপকূলীয় এলাকা বন্ধ করে দিতে হয়েছে, আর তেল ভেসে উঠছে সৈকতের বালিতেও।
সোমবারের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, জেম নম্বর-২ নামের একটি জাহাজের অবস্থান ও আকারের সঙ্গে মিলে যাওয়া একটি ট্যাংকার থেকে তেল ছড়াতে শুরু করেছে। জাহাজটি ৯ থেকে ১০ অক্টোবরের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যখন ইরানের পক্ষ থেকে জাহাজে হামলার রেকর্ড ঢেউ চলছিল।
বুধবারের মধ্যে স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা যায়, তেলের আস্তরণ ট্যাংকারটি থেকে ৩৫ কিলোমিটারেরও বেশি দূরত্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রথমে ১৯ অক্টোবর জাহাজটি থেকে তুলনামূলক ছোট আকারের তেল চুইয়ে পড়তে দেখা গেলেও দুই দিনের মধ্যে তা দ্রুত বিস্তৃত হয় বলে বিবিসি ভেরিফাই ও গোয়েন্দা সংস্থা এমএআইএআর পর্যালোচিত রাডার স্যাটেলাইট ছবিতে উঠে এসেছে।
আমিরাত কর্তৃপক্ষ বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, ঘটনাটি উত্তরাঞ্চলীয় শহর উম্ম আল কুওয়াইনের কাছের সৈকতগুলোকে প্রভাবিত করছে। শুক্রবারের যাচাই করা ভিডিওতে দেখা গেছে, তেল তীরে এসে আছড়ে পড়ছে এবং পানির রঙ কালো হয়ে গেছে।
আমিরাতের জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, পরিবেশগত প্রভাব সীমিত রাখতে তারা ‘অবিলম্বে তেল আটকানোর কাজ শুরু করেছে’।
সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা ভ্যানগার্ড জানিয়েছে, পানামার পতাকাবাহী ট্যাংকারটি ৯ অক্টোবর আল জাজিরা আল হামরা শহরের ঠিক উত্তরে ‘অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের’ আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, জাহাজে আগুন ধরে যায় যা পরে নেভানো হয়। ১০ অক্টোবর সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করা যাচাইকৃত ফুটেজে দেখা যায়, জাহাজের ওপর কালো ধোঁয়ার বিশাল মেঘ উঠতে থাকার মধ্যে নাবিকরা ডেকে দৌড়াদৌড়ি করে লাইফজ্যাকেট পরছেন।
জাহাজে থাকা ২২ জন ভারতীয় নাবিকের সবাইকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে দুবাইয়ে ভারতীয় কনস্যুলেট ১১ অক্টোবর জানিয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জেম নম্বর-২-এর সঙ্গে মিলে যাওয়া একটি জাহাজের ফুটেজ প্রচার করেছে, যাতে জাহাজটিতে আগুন জ্বলতে এবং জ্বলন্ত তেল সাগরে ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের দাবি, জাহাজটি ‘অননুমোদিত ও বিপজ্জনক পথ’ দিয়ে হরমুজ প্রণালী অতিক্রমের চেষ্টা করছিল।
জেম নম্বর-২ অক্টোবরের শুরুতে হরমুজ প্রণালী ও এর আশপাশে হামলার শিকার হওয়া রেকর্ডসংখ্যক জাহাজের একটি। নিরাপত্তা বিশেষজরা বিবিসি ভেরিফাইকে বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীর আরও বেশি জাহাজ চলাচলে সহায়তার জবাবে প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদারের ইরানি প্রচেষ্টার অংশ ছিল এই হামলাগুলো।
পরিবেশগত ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ সবচেয়ে বেশি। আমিরাতে অবস্থিত শারজাহ মেরিন সায়েন্স রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক স্টিভ উইডিকম্ব বিবিসি ভেরিফাইকে বলেছেন, প্রভাব পড়া ‘অবশ্যম্ভাবী’, তবে ক্ষতির পরিমাণ মূল্যায়নের সময় এখনো আসেনি বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন।
তেল ছড়িয়ে পড়লে সামুদ্রিক প্রাণীর তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটতে পারে—যেমন কচ্ছপ শারীরিকভাবে আটকে যাওয়া, সামুদ্রিক পাখির পালক ঢেকে যাওয়া কিংবা মাছের ফুলকার ক্ষতি। আবার প্রজাতিগুলো দীর্ঘদিন তেলের বিষাক্ত উপাদানের সংস্পর্শে থাকলে প্রজনন ক্ষমতায় প্রভাব পড়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিও হতে পারে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক উইডিকম্ব।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, তেলের আস্তরণ সিনিয়াহ ও খোর আল বেইদাহ দ্বীপের দিকে বিস্তৃত হচ্ছে—যা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য এলাকা। সেখানে প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস ও লবণাক্ত জলাভূমির পাশাপাশি সবুজ কচ্ছপ এবং মহাবিপন্ন হালাভি গিটারফিশের মতো প্রজাতি রয়েছে। কনফ্লিক্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট অবজারভেটরির বিজ্ঞানী ইওগান ডার্বিশায়ারের মতে, এই এলাকার সান্নিধ্যই ‘সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিবেশগত দিক’।
গবেষকরা বলছেন, এই পর্যায়ে পরিবেশগত প্রভাব খুবই অনিশ্চিত; তা নির্ভর করবে ছড়িয়ে পড়া তেলের পরিমাণ ও ধরন, তা কত দ্রুত বাষ্পীভূত বা ভেঙে যাচ্ছে এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযানের কার্যকারিতার ওপর। গত আগস্টেও ইরানের কেশম দ্বীপের তীরে বড় তেলের আস্তরণ ভেসে উঠেছিল, যা বন্যপ্রাণী, সংরক্ষিত বাস্তুতন্ত্র ও মাছ ধরার সম্প্রদায়ের জন্য হুমকি তৈরি করেছিল।
হরমুজ প্রণালীতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের মধ্যে উভয় পক্ষের হামলার শিকার হচ্ছে ট্যাংকারসহ বাণিজ্যিক জাহাজগুলো। বিশ্বের তেল পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে সংঘাতের পরিবেশগত মূল্য এখন আমিরাতের উপকূলে দৃশ্যমান হচ্ছে, আর পরিচ্ছন্নতা ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজই এখন সবার নজরে।






