১৪ বছর ধরে চলা ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্ত: ভেঙে ফেলা হবে অবকাঠামো, সড়ক হবে ছয় লেনের
ঢাকা-গাজীপুর বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হতে যাচ্ছে। রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত নির্মিত বিশেষ লেন ও স্টেশন অবকাঠামো অপসারণ করে সড়কটি ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনি জটিলতা নিরসনের পর জরুরি ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আগামী ১৫ দিনের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে হবে।
২০১২ সালের নভেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় বিআরটি প্রকল্প প্রথম অনুমোদন পায়। কম সময়ে দ্রুত যাতায়াতের লক্ষ্যে প্রাথমিক পরিকল্পনায় গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ঢাকার কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত বিআরটি লেন তৈরির কথা ছিল। পরে সময় ও ব্যয় সামলাতে কেরানীগঞ্জ অংশ বাদ দিয়ে বিমানবন্দর পর্যন্ত ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলাকায় প্রকল্প সীমিত করা হয় — এর মধ্যে ১৫ দশমিক ০৭ কিলোমিটার সড়কপথ এবং বাকিটা উড়ালপথ, সড়কের মাঝখানে দুটি পৃথক লেনে বিশেষ বাস চলার পরিকল্পনা ছিল।
প্রকল্প চালুর সময় বলা হয়েছিল, বিআরটি চালু হলে চান্দনা চৌরাস্তা থেকে ৩০ মিনিটে বিমানবন্দরে পৌঁছানো যাবে। প্রতি ঘণ্টায় ২০ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন বলেও জানানো হয়েছিল। বিশেষ বিআরটি বাস যানজট, সিগন্যাল কিংবা অন্য বাধা ছাড়াই পৃথক লেন দিয়ে চলবে — এটাই ছিল পরিকল্পনার প্রতিশ্রুতি।
২০১২ সালে প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৩৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা এবং ২০১৬ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশ সরকার, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা ও গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি যৌথভাবে অর্থায়নে যুক্ত ছিল। বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সেতু বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর; তিনটি চীনা প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজের ঠিকাদারি পায় এবং বিআরটি পরিচালনার জন্য ২০১৩ সালে গঠন করা হয় ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি।
পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশা শেষ না করেই প্রকল্প শুরু করায় শুরু থেকেই নানা জটিলতা দেখা দেয়। জলাবদ্ধতা নিরসনে পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা রাখা হয়নি, বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন স্থানান্তরের পূর্বপরিকল্পনা ছিল না, নির্মাণকালে ব্যস্ত মহাসড়কে বিকল্প যান চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয়নি, ছিল না সড়কবাতি ও ফুটপাত। ধীরগতি, ভূমি অধিগ্রহণ ও নকশা পরিবর্তনের জটিলতায় নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে, ২০১৮ সালে মাঠপর্যায়ে বড় আকারে নির্মাণকাজ শুরু হয়।
টানা ১৪ বছরের অগোছালো নির্মাণকাজে সড়কের মাঝখানে বসানো সিমেন্টের প্রতিবন্ধক ও লোহার বেড়ার কারণে রাস্তা সরু হয়ে পড়ে। বিমানবন্দর-গাজীপুর পথে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ ও পোশাকশ্রমিক ধুলাবালি ও দীর্ঘ যানজটের শিকার হন। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও ঠিকাদারের দায়িত্বহীনতায় নির্মাণকাজের সময় ক্রেন দুর্ঘটনা ও গার্ডার ধসে নিরাপত্তারক্ষী জিয়াউর রহমানসহ অন্তত সাতজন পথচারী ও শ্রমিক মারা যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০১৬ সালের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়, তখন ব্যয় পুনর্নির্ধারণ করা হয় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা — মূল ব্যয়ের দ্বিগুণের বেশি। ২০২৫ সালে মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো এবং প্রাক্কলিত ব্যয় ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়; ওই বছরের ২৭ জুলাই একনেক সভায় বর্ধিত প্রস্তাবটি বাতিল করা হয়।
বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে ১৫টি স্টেশন অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে, তবে কোনো স্টেশনের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। যাত্রীদের ওঠানামার জন্য নির্মিত কয়েকটি পদচারী সেতুতে চলন্ত সিঁড়ি ও লিফট রয়েছে; বর্তমানে এসব স্থাপনা ব্যবহার করা যাচ্ছে না — কোথাও যন্ত্রপাতিতে জং ধরেছে, কোথাও অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে।
সিদ্ধান্ত নিয়ে মতভেদও স্পষ্ট। গাজীপুর মহানগরীর বাসিন্দা বুরহান উদ্দিন অরণ্য বলেন, 'নিজের পকেটের টাকা খরচ করার সময় পাই পাই করে সবাই হিসাব-নিকাশ করে। আর এগুলো তো জনগণের টাকা, এজন্য হিসাব-নিকাশ, পরিকল্পনা নেই। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করার পর এখন আবার ভাঙতে হবে। সেখানেও কোটি কোটি টাকা ব্যয় হবে। এগুলো কার টাকা? ৯৭ ভাগ কাজ শেষেও একটি প্রকল্প কেন বাতিল হবে?' গাজীপুর মহানগর জামায়াতের আমির অধ্যাপক জামাল উদ্দিন বলেন, সরকার এটি ভাঙলে অদূরদর্শিতার পরিচয় দেবে; বিআরটিকে উন্নত ব্যবস্থাপনায় চালু করা ভালো হবে। গাজীপুর জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিকের সাধারণ সম্পাদক ইফতেখার শিশির বলেন, জনগণের রাজস্বের অর্থ অপচয় করে শেষ মুহূর্তে প্রকল্প বন্ধ ও ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত অত্যন্ত হতাশাজনক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং এই চরম মাশুল শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণকেই দিতে হচ্ছে। প্রকল্প বাতিলের প্রতিবাদে গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে অবস্থান কর্মসূচি ও মানববন্ধন করেছে সচেতন নাগরিক ঐক্য, গাজীপুর; অবশিষ্ট কাজ শেষ করে দ্রুত চালুর দাবি জানিয়েছেন এনসিপি নেতা আলী নাছের খান।
অন্যদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার বলেন, 'বর্তমান সরকার বাস্তবসম্মত একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই বিআরটি প্রকল্প ফ্যাসিস্ট সরকারের লুটপাটের একটি খাত ছিল, যা সাধারণ মানুষের গলার কাঁটা হয়ে রয়েছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে গাজীপুর অংশে চলাচলকারী মানুষ প্রায় ১৪ বছর ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে গাজীপুর দিয়ে চলাচলকারী বাস ও যাত্রীদের স্বস্তি ফিরে আসবে।' প্রকল্পটি নিয়ে ভাঙা ও না ভাঙার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি রয়েছে এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন বিআরটি অবকাঠামো না ভাঙার দাবিতে অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেছে।
গাজীপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ বলেন, 'আমরা এখন পর্যন্ত লিখিত কোনো চিঠি পাইনি, বিভিন্ন সংবাদপত্রে দেখেছি। দাপ্তরিকভাবে চিঠি পেলে বুঝতে পারব কী করতে হবে। আমাদের যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হবে, আমরা সেভাবেই কার্যক্রম করব।' তিনি আরও বলেন, সোমবার সভা হওয়ার পর মঙ্গলবার থেকে পূজার বন্ধ শুরু হয়, একটি চিঠি ফেসবুকে ঘুরছে — সেটি সঠিক কি না, রোববার অফিস খুললে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এখন সামনে দুটি প্রশ্ন: উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনায় আইনি জটিলতা কীভাবে মিটবে, আর ১৫টি অসমাপ্ত স্টেশনসহ নির্মিত অবকাঠামো অপসারণ ও ছয় লেনে রূপান্তরের কাজ কত দ্রুত শুরু হবে। ১৫ দিনের অগ্রগতি প্রতিবেদন ও প্রতি মাসের ৩ তারিখের প্রতিবেদনের নির্দেশ দেখাচ্ছে, সরকার সিদ্ধান্তটি কাগজে না রেখে বাস্তবায়নের হিসাব চাইছে — ১৪ বছরের প্রকল্পটির শেষ অধ্যায় এখন সেই বাস্তবায়নের গতির ওপর নির্ভর করছে।




