টঙ্গীতে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ: বাবা-মায়ের পর চলে গেল মেয়ে তানিশাও, এক পরিবারের তিনজন শেষ
গাজীপুরের টঙ্গীতে রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের পাইপ লিকেজ থেকে ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণের ঘটনায় বাবা-মায়ের পর এবার মারা গেছে তাদের মেয়ে তানিশা (১৬)। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ নিয়ে একই পরিবারের তিনজনই প্রাণ হারালেন এই দুর্ঘটনায়।
তানিশার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার মামা মো. জিহাদ আলী। তিনি জানান, গত বুধবার রাত ৮টার দিকে তার ভগ্নিপতি লাল চান মিয়া (৬০) ও বোন নাসিমা (৫০) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। দুই দিন পর শুক্রবার সকালে তাদের মেয়েও চলে গেল।
পরিবারটি টঙ্গী পশ্চিম থানার ৫২ নম্বর ওয়ার্ডের মুদাফা এলাকার মাস্টার বাড়িসংলগ্ন ফখরুল হাসানের বাসায় ভাড়া থাকত। স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে ওই বাসায় রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাস সিলিন্ডারের পাইপ লিকেজ হয়ে ঘরে গ্যাস জমে যায়।
একপর্যায়ে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন ছড়িয়ে পড়লে লাল চান মিয়া, তার স্ত্রী নাসিমা ও মেয়ে তানিশা গুরুতর দগ্ধ হন। পরে প্রতিবেশীরা তাদের উদ্ধার করে ঢাকার জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করেন। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে তিনজনের মৃত্যু হলো।
টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুর রহমান মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, চিকিৎসাধীন অবস্থায় তানিশার মৃত্যু হয়েছে, এর আগে তার বাবা-মা মারা যান। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কার্যক্রম চলছে।
তানিশার মামা জিহাদ আলী জানিয়েছেন, আইনি প্রক্রিয়া শেষে তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। বাবা-মায়ের পর কিশোরী মেয়েটির মৃত্যুতে পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ঘটনাটি আবারও সামনে এনেছে বাসাবাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের নিরাপত্তার প্রশ্ন। পাইপ লিকেজ থেকে ঘরে গ্যাস জমে যাওয়া এবং তার পর বিস্ফোরণ—এই ধরনের দুর্ঘটনা বাংলাদেশে প্রায়ই ঘটে এবং প্রায় প্রতিবারই প্রাণহানি ঘটে। একটি ছোট্ট লিকেজ থেকে কীভাবে একটি পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, টঙ্গীর এই ঘটনা তার করুণ উদাহরণ।
দুর্ঘটনার ক্রমটি ছিল এমন—সকাল ৭টার দিকে রান্নার প্রস্তুতির সময়েই সম্ভবত লিকেজ থেকে গ্যাস ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বদ্ধ ঘরে গ্যাস জমে বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছালে বিস্ফোরণ ঘটে এবং মুহূর্তের মধ্যে আগুন তিনজনকে গ্রাস করে। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলেও কাউকেই বাঁচানো যায়নি।
প্রথমে বুধবার রাতেই মারা যান লাল চান মিয়া ও নাসিমা দম্পতি। এরপর দুই দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শুক্রবার সকালে হেরে গেল ১৬ বছরের তানিশা। পরিবারের তিন সদস্যের এভাবে পরপর মৃত্যু এলাকাজুড়ে শোকের আবহ তৈরি করেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহ হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কাজ চলছে। ঘটনার বিস্তারিত তদন্তের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
শেষ পর্যন্ত একটি ভাড়া বাসার রান্নাঘরের লিকেজ একটি পরিবারের সবাইকে নিয়ে গেল। বিশেষজ্ঞরা বরাবরই বলে আসছেন, সিলিন্ডারের পাইপ ও রেগুলেটর নিয়মিত পরীক্ষা করা, লিকেজের গন্ধ পেলে আগুন না জ্বালিয়ে দরজা-জানালা খুলে দেওয়া এবং সন্দেহ হলে সিলিন্ডারের মুখ বন্ধ করে দেওয়ার মতো সাধারণ সতর্কতাই এমন বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে পারে। টঙ্গীর এই মর্মান্তিক ঘটনা সেই সতর্কতার প্রয়োজনীয়তাকেই আবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।




