ছদ্মবেশে প্রেমের সম্পর্কের অভিযোগ: ব্রিটেনের ‘স্পাই কপ’ বিতর্কে নতুন করে মুখোমুখি কোল্স ও জেসিকা
ব্রিটেনের ছদ্মবেশী পুলিশি তৎপরতা নিয়ে চলমান সরকারি তদন্তে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন সাবেক মেট্রোপলিটন পুলিশ কর্মকর্তা অ্যান্ড্রু কোল্স। একসময় গোপন পরিচয়ে প্রতিবাদী সংগঠনে অনুপ্রবেশ করা এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ছদ্মবেশে থাকা অবস্থায় এক তরুণী কর্মীকে প্রতারণা করে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। কোল্স অবশ্য সব অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি নিজেই এক প্রতারণার শিকার।
কোল্সের বর্তমান জীবন তাঁর গোপন অতীত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ৬৬ বছর বয়সী এই ব্যক্তি এখন স্ত্রী ও তাঁদের গ্রেহাউন্ড কুকুর নিয়ে কেমব্রিজশায়ারের গ্রামাঞ্চলে একটি খড়ের চালের কুটিরে বাস করেন। তিনি একটি গির্জার গায়কদলে গান করেন এবং স্থানীয় রক্ষণশীল রাজনীতিতে সক্রিয়। অথচ ১৯৯০ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে তিনি মেট্রোপলিটন পুলিশ সার্ভিসের ছদ্মবেশী ইউনিট স্পেশাল ডেমোনস্ট্রেশন স্কোয়াডে (এসডিএস) কর্মরত ছিলেন, যে ইউনিট রাজনৈতিক ও প্রতিবাদী গোষ্ঠীগুলোতে অনুপ্রবেশ করত।
এই ইউনিটের কার্যকলাপ নিয়ে বিগত এক দশক ধরে তদন্ত চালাচ্ছে আন্ডারকভার পুলিশিং ইনকোয়ারি (ইউসিপিআই)। ২০১৫ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টেরেসা মে প্রতিষ্ঠিত এই তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে, কর্মকর্তারা নারীদের প্রতারণা করে সম্পর্কে জড়িয়েছেন কি না, নিহত কিশোর স্টিফেন লরেন্সের পরিবারের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করা হয়েছে কি না, মৃত শিশুদের নাম ধারণ করা হয়েছে কি না এবং বিনা কারণে বিভিন্ন গোষ্ঠীতে অনুপ্রবেশ ঘটেছে কি না।
অভিযোগকারী নারীর নাম জেসিকা — এটি তাঁর আসল নাম নয়। তিনি একজন পশু অধিকারকর্মী। তাঁর অভিযোগ, ওই কর্মকর্তা প্রতারণা করে তাঁর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হতে তাঁকে বাধ্য করেছিলেন। মেট্রোপলিটন পুলিশ নিজেই স্বীকার করেছে যে কোল্সের সঙ্গে জেসিকার সম্পর্ক ছিল। বাহিনীর কমিশনার স্যার মার্ক রাউলি লিখেছেন, কোল্স তদন্তে সত্য না বলায় বাহিনী হতাশ। কোল্সের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে যে তিনি একই ধরনের সম্পর্ক রাখার বিষয়ে সহকর্মীদের পরামর্শ দিয়েছিলেন।
ঘটনার শুরু ১৯৯১ সালে। এক মৃত শিশুর নাম থেকে ‘অ্যান্ডি ডেভি’ ছদ্মনাম নিয়ে কোল্স যোগাযোগ গড়ে তোলেন চরমপন্থি প্রত্যক্ষ পদক্ষেপ সমর্থক গোষ্ঠী অ্যানিমেল লিবারেশন ফ্রন্টের সঙ্গে। জেসিকার স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, তিনি তখন উনিশ বছরের এক সরল তরুণী, পূর্ব লন্ডনের একটি শেয়ার করা টেরেস ফ্ল্যাটে থাকতেন এবং রোমাঞ্চের সন্ধানে ছিলেন। ডেভি ছিলেন তাঁর চেয়ে বয়স্ক, অগোছালো একজন মানুষ, যিনি একটি ভ্যান চালাতেন — আর এই বিষয়টিই তাঁকে জেসিকার সমমনা কর্মীদের ঘনিষ্ঠ মহলে প্রিয় করে তুলেছিল।
জেসিকা বলেন, অনেক রাতে ডেভি বাড়িতে আসত এবং তাঁকে তাড়াতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হতো। তারপর এক রাতে, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই, সে তাঁকে চুমু খেতে আসে। পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার মতো সাহস তাঁর ছিল না এবং সে-ই হয়ে ওঠে তাঁর প্রথম সত্যিকারের প্রেমিক। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন: জেসিকা ভেবেছিলেন ডেভির বয়স ২৪, প্রকৃতপক্ষে তাঁর বয়স ছিল ৩২, তিনি বিবাহিত ছিলেন এবং তাঁর সন্তানও ছিল। তিনি শিকারে বাধা দেওয়ার কোনো সহযোগীও ছিলেন না; অ্যানিমেল লিবারেশন ফ্রন্টের বেশ কয়েকজন সদস্য অগ্নিসংযোগ ও বোমা হামলার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর সংগঠনটির বিরুদ্ধে চলা ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে তিনি গোপনে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন।
জেসিকার ভাষায়, ‘সে আমাকে নিজের বশে এনেছিল। সে সপ্তাহে বেশ কয়েকবার আমার একার বিছানায় ঘুমাতো, আর আমি জানতাম না সে আসলে কে। এটাকে ধর্ষণ বলা কঠিন, কিন্তু সে জানত যে আমার সাথে যৌনমিলন করাটা আমার সম্মতির বিরুদ্ধে হতো।’ কোল্স একবার জেসিকার বিছানায় শোয়ার কথা স্বীকার করলেও বলেছেন, সেখানে কোনো যৌন সংসর্গ হয়নি। তাঁর দাবি, ‘তার গল্পটা সত্যি নয়, একেবারেই সত্যি নয়।’ তবে প্রমাণের গুরুত্ব সম্পর্কে চাপ দিলে তিনি স্বীকার করেন, ‘এটাকে খণ্ডন করা খুব কঠিন।’
প্রমাণ হিসেবে সামনে এসেছে ১৯৯৩ সালে ফ্রান্সে থাকাকালীন জেসিকার সবচেয়ে কাছের বন্ধুকে লেখা দুটি হাতে লেখা চিঠি। প্রথমটিতে তিনি লেখেন, ‘ব্যাপারটা সত্যিই অদ্ভুত, কিন্তু আমি এখনো অ্যান্ডির সাথে প্রেম করছি।’ দ্বিতীয় চিঠিতে ছিল আরও বিস্ফোরক প্রস্তাবের উল্লেখ। কোল্সের তত্ত্ব হলো, দ্বিতীয় চিঠিটি অনেক পরে লেখা হয়ে প্রমাণের বান্ডিলে যুক্ত করা হয়েছে, কারণ এর হাতের লেখা প্রথম চিঠির প্রায় শিশুসুলভ হিজিবিজির মতো নয়, বরং মার্জিত কারসিভ। জেসিকা পাল্টা বলেন, ধীরে লিখলে তিনি লেখা পরিপাটি করতে পারেন, কিন্তু তাড়াহুড়ো বা রাগের সময় লেখা সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়। ফরেনসিক গ্রাফোলজিস্ট কেট বার বলেছেন, জেসিকার হাতের লেখায় ভিন্নতা দেখা যাচ্ছিল এবং এটা সম্ভব যে তিনি চিঠি দুটি প্রায় একই সময়ে লিখেছিলেন।
এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে কোল্স বলেছেন, একজন ভালো ছদ্মবেশী কর্মকর্তার জন্য প্রয়োজন সহনশীলতা, সাহসিকতা এবং নির্মমতা। ‘আমারও তাই মনে হয়,’ তিনি বলেন, ‘যদিও আমি আমার নিজের ব্যক্তিত্বের চেয়ে খুব একটা ভিন্ন আচরণ করিনি।’ বিশ্বাস অর্জন ও পরিচয় গোপন রাখতে তাঁকে মাঝে মাঝে আইন ভাঙতে হতো বলেও স্বীকার করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘আমি মাদক নিতাম — গাঁজা। এটা জরুরি ছিল — আপনার বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য অন্য কাউকে তো সাক্ষ্য দিতে হতো।’ তিনি একটি কসাইয়ের দোকানের জানালায় অ্যাসিড বলে দেওয়া বোতলের তরল ছিটিয়ে দেওয়া এবং মুরগির খামারে অভিযানে জড়িত থাকার কথাও বলেছেন, যেখানে কিছু মুরগি চুরি হয়েছিল ও সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছিল। তবু তাঁর দাবি, ‘কাজটা অবশ্যই সবার পছন্দের ছিল না, কিন্তু আমি সমাজের একটি অংশকে কিছু অত্যন্ত বিপজ্জনক লোকের হাত থেকে রক্ষা করেছি এবং আমার মনে হয় আমি ভালো কাজই করেছি।’
২০২৪ সালে তদন্তে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় কোল্সকে তাঁর গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নারী কর্মীদের ‘সুন্দর চেহারা’ সম্পর্কিত উল্লেখ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ‘আপনি যে নারীদের সঙ্গে মেলামেশা করছিলেন, তাদের যৌন আকর্ষণের বিষয়টি কি আপনার মাথায় ছিল?’ — প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, আমার জন্য নয়, কিন্তু ব্যাপারটা অবশ্যই উল্লেখযোগ্য ছিল।’ এরপর তাঁকে বিভিন্ন সাক্ষীর বিবরণ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়, যাঁদের অনেকে তাঁকে ‘যৌন উৎপীড়ক’, ‘অদ্ভুত লোক’ ও ‘লম্পট’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেন, তিনি নারীদের পিছু নিতেন এবং অবাঞ্ছিত সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করতেন। তিনজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, তাঁরা তাঁকে ভ্যানে জেসিকার সঙ্গে অন্তরঙ্গ অবস্থায় অথবা শুধু বক্সার শর্টস পরে তাঁর শোবার ঘর থেকে বের হতে দেখেছেন। কোল্স এসব গল্পকে ‘পুরোপুরি মনগড়া’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
কোল্সের পরিচয় উন্মোচিত হয় অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁর খ্যাতনামা ভাইয়ের মাধ্যমে, যিনি ২০১৪ সালের আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, তাঁর বড় ভাই স্পেশাল ব্রাঞ্চে যোগ দিয়ে ছদ্মবেশে দ্বৈত জীবনযাপন করছিলেন, কোনো এক অশুভ সংগঠনে অনুপ্রবেশ করেছিলেন, আর এদিকে তাঁর স্ত্রী ও শিশুকন্যা অনিয়মিত সাক্ষাতের ওপর নির্ভর করে দিন কাটাত। ২০১৮ সালে ইউসিপিআইতে কোল্সের পরিচয় ‘অ্যান্ডি ডেভি’ বা অপারেটিভ এইচএন২ হিসেবে নিশ্চিত করা হয়। ভাইয়ের ওই লেখা নিয়ে কোল্স বলেন, ‘সে এমনটা না করলে হয়তো ব্যাপারটা সহজ হতো, কিন্তু আমার কোনো বিদ্বেষ নেই; সে আমার ভাই এবং আমি তাকে গভীরভাবে ভালোবাসি।’
জেসিকার জন্য এই উপলব্ধি ছিল আরও কঠিন। তিনি তখন একটি ব্যবসা ও আর্ট স্টুডিও গড়ে তোলার প্রক্রিয়ায় ছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘তারা এই মানুষটিকে তৈরি করেছে এবং তাকে আমার জীবনে, আমার বিছানায় ঢুকিয়ে দিয়েছে। এটা এক চরম লঙ্ঘন। এটা ছিল রাষ্ট্রের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হওয়ার মতো। সে আমার বাবা-মা, আমার বন্ধুদের ওপর নজরদারি করছিল। আর কেন? আমি তো শিকারে বাধা দিতাম। আমার কোনো অপরাধমূলক রেকর্ড নেই... আর এই সব অফিসাররা শুধু মুরগি উদ্ধার করতে আসা লোকজনদের দেখছিল।’
২০১২ সালে মেট্রোপলিটন পুলিশ ছাড়ার পর কোল্স পিটারবোরো সিটি কাউন্সিলে এবং কেমব্রিজশায়ারের ডেপুটি পুলিশ ও ক্রাইম কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু মুখোশ উন্মোচনের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। জেসিকা ও তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে নারী নিপীড়ক আখ্যা দিয়ে কাউন্সিল সভায় প্রতিবাদ জানান এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করেন। কোল্স বলেন, ‘তারা কাউন্সিলের নেতার সঙ্গে দেখা করেছে; আমি যে দাতব্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে জড়িত, সেগুলোতে তারা চিঠি লিখে বলেছে, এই লোকটিকে বিশ্বাস করবেন না; তারা প্রচারপত্রও তৈরি করেছে।’ পিটারবোরো কনজারভেটিভ অ্যাসোসিয়েশনের প্রাক্তন সভাপতি কোল্স ২০২৪ সালে তাঁর কাউন্সিলর আসনটি হারান এবং দুইবার পুনর্নির্বাচনে অসফলভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
২০১৯ সালে পিটারবোরোর একটি আবাসিক এলাকায় দুজনের আবার মুখোমুখি হওয়ার ঘটনাও তদন্তে উঠে এসেছে। জেসিকা বলেন, ‘আমি ঘুরে দাঁড়াতেই দেখি, সে আমার ও আমার সহকর্মীর থেকে প্রায় ১০ ফুট দূরে দাঁড়িয়ে আমার মুখের সামনে ক্যামেরা ধরে আমাদের ভিডিও করছে আর বলছে, তোমাদের জেলে যেতে হবে। গত ৩০ বছরে সে আমার এত কাছে এসেছিল যে আমি শুধু দূরে চলে যেতে চেয়েছিলাম।’ কোল্স স্বীকার করেছেন, তিনি এক ব্যক্তির হাত থেকে কয়েকটি প্রচারপত্র ছিনিয়ে নিয়েছিলেন।
জেসিকার অবস্থান স্পষ্ট: ‘তার ক্ষমতাধর পদে থাকা উচিত নয়। যখন আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল, তখন সে ক্ষমতাশালী পদে ছিল এবং সবচেয়ে জঘন্যভাবে সেই ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে।’ তিনি বলেন, মানুষের এটা জানা দরকার এবং তিনি চান না কোল্স অন্য কারও সঙ্গে এমনটা করুক। অন্যদিকে কোল্স এখনও নিজের নির্দোষিতার দাবিতে অনড়। দশকজুড়ে চলা এই তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনই শেষ পর্যন্ত ঠিক করে দেবে, রাষ্ট্রীয় গোপন অভিযানের নামে যা ঘটেছিল, তার দায় কার কাঁধে কতটা বর্তায়।





