নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০–৭০০ টাকা বেশিতে বিক্রি হচ্ছে এলপিজি, বিইআরসিতে জমেছে দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের স্তূপ
এক মাসের বেশি সময় ধরে সরকার-নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে ১২ কেজির তরল পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার। বাজারের এই অস্থিরতার মধ্যেই নানা স্তরে দাম ও পরিচালন ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাবের স্তূপ জমেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি)।
বেসরকারি আমদানিকারক ও বোতলীকরণ কোম্পানিগুলো কয়েকটি স্তরে পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে। পরিবেশক ও খুচরা বিক্রি পর্যায়েও কমিশন বৃদ্ধির প্রস্তাব জমা পড়েছে বিইআরসিতে। এমনকি খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান এলপি গ্যাস লিমিটেডও সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ৮২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ২৩৫ টাকা ৪২ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে। এসব প্রস্তাবের ওপর আগামী ২৯ অক্টোবর গণশুনানি করতে যাচ্ছে বিইআরসি।
দেশে প্রতি মাসে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টন এলপিজি ব্যবহার হয়। এর মধ্যে মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ বিক্রি করে সরকারি কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেড। চাহিদার বাকিটা পূরণ করে ১০ থেকে ১২টি বেসরকারি কোম্পানি, যারা গ্যাস আমদানি করে থাকে।
বেসরকারি এলপিজির দাম প্রতি মাসে নির্ধারণ করা হলেও সরকারি কোম্পানির এলপিজির দাম এক বছরের বেশি সময় ধরে স্থির রয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি সরকারি এলপিজির দাম ৬২ টাকা ১৫ পয়সা; অথচ বেসরকারি গ্যাসের দাম তার দ্বিগুণের বেশি—প্রতি কেজি ১৫৩ টাকা ০৬ পয়সা। দামের এই বিশাল বৈষম্যের কারণে সরকারি এলপিজি নিয়ে নানা ধরনের অনিয়ম চলে থাকে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।
গত ফেব্রুয়ারি মাসেই বিইআরসির কাছে সরকারি এলপি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব জমা হয়েছিল। সম্প্রতি সেই প্রস্তাব প্রকাশ করা হয়। প্রস্তাবে সৌদি চুক্তিমূল্য (সিপি) অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণের পাশাপাশি ডিলারদের পরিবহন খরচ ২১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪৮ টাকা এবং কমিশন ২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫২ টাকা করার কথা বলা হয়েছে।
সরকারি কোম্পানির যুক্তি, বিইআরসি ২০২৫ সালের মে মাসে সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ৬৯০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮২৫ টাকা করেছিল, আর গত জানুয়ারিতে বেসরকারি গ্যাসের সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৩৬০ টাকা। বেসরকারি সিলিন্ডারের তুলনায় বিপিসির সিলিন্ডারের দাম অনেক কম হওয়ায় সরকারি গ্যাস বেসরকারি সিলিন্ডারে ভরে (ক্রস ফিলিং) নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি করা হয়। এতে প্রান্তিক পর্যায়ে অনেক গ্রাহক কম দামে সরকারি এলপি গ্যাস পাচ্ছেন না।
আরেকটি যুক্তিতে বলা হয়, সরকারি শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) প্রোপেন ও বিউটেন ৩৫:৬৫ অনুপাতে মিশিয়ে এলপিজি প্রস্তুত করা হয়। তাই বেসরকারি খাতের মতো সরকারি এলপিজির ক্ষেত্রেও প্রতি মাসে ওই দুই উপাদানের সৌদি সিপি মূল্য ৩৫:৬৫ অনুপাতে গড় করে দাম নির্ধারণ করা যুক্তিযুক্ত।
উল্লেখ্য, হাইকোর্টের নির্দেশনায় ২০২১ সালের এপ্রিলে প্রথমবারের মতো সরকারি ও বেসরকারি এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। পরে ওই বছরের অক্টোবরে পদ্ধতি বদলে সৌদি জ্বালানি কোম্পানি আরামকোর প্রতি মাসের চুক্তিমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে বেসরকারি এলপিজির দাম নির্ধারণ শুরু করে কমিশন।
অন্যদিকে বেসরকারি কোম্পানিগুলো ব্যাংকঋণের সুদহার, পরিবহন খরচ, কারখানা পরিচালনা ও নিরাপত্তা ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে কমিশন বৃদ্ধিসহ বাজারজাতকরণের বিভিন্ন ধাপে বাড়তি ব্যয়ের সমন্বয় চায়। নতুন প্রস্তাবে তারা কেজিপ্রতি গ্যাস মজুত ও বোতলীকরণের খরচের সঙ্গে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের ওপর মুনাফা বাড়ানোর আবেদন করেছে।
তবে বেসরকারি কোম্পানিগুলোর দেওয়া প্রস্তাবে খরচের হিসাবে ব্যাপক পার্থক্য দেখা গেছে। প্রতি কেজি এলপিজি মজুত ও বোতলজাত করার খরচ ওমেরা এলপিজি ১২ টাকা ২৫ পয়সা, ফ্রেশ এলপিজি ২৫ টাকা, ডেল্টা এলপিজি ৩০ টাকা এবং পেট্রোম্যাক্স এলপিজি সাড়ে ১৯ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
ওমেরার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বিইআরসি প্ল্যান্ট পর্যায় পর্যন্ত প্রতি ১২ কেজি রিফিল সিলিন্ডারের জন্য অপারেটর ব্যয় আনুমানিক ২১২ টাকা ধরে। এর বাইরে আছে জাহাজ ভাড়া, ভ্যাট ও গুদাম পর্যন্ত পরিবহন খরচ। অপারেটরদের প্রকৃত ব্যয় আনুমানিক ৪৭৮ টাকা। কোম্পানিটি পরিবেশকের কমিশন ৫০ টাকা অপরিবর্তিত রেখে খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ থেকে ৮০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে। কয়েকটি খাতে ব্যয় কম দেখিয়ে সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ টাকা দাম বাড়ানোর হিসাব দিয়েছে ওমেরা।
মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ এলপিজি মজুত ও বোতলীকরণ খরচ প্রতি কেজিতে ১৬ টাকা ৭৪ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশকের কমিশন প্রতি কেজিতে ৪ টাকা ১৭ পয়সা থেকে ১০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৩ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৫০ পয়সা করার দাবি জানিয়েছে।
মেঘনার বক্তব্য, ব্যাংকঋণের সুদ বেড়ে বছরে প্রায় ১৫ শতাংশ হয়েছে। পাশাপাশি সিলিন্ডারের নিরাপত্তা পরীক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। বিনিয়োগের ওপর বছরে ২০ শতাংশ মুনাফা বিবেচনার প্রস্তাবও দিয়েছে কোম্পানিটি।
ডেল্টা এলপিজি মজুত ও বোতলীকরণ খরচ প্রতি কেজিতে ১৫ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩০ টাকা করার দাবি জানিয়েছে। তারা পরিবেশকের কমিশন প্রতি কেজিতে ৮ টাকা ৩৩ পয়সা এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ১০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
পেট্রোম্যাক্স এলপিজি মজুত ও বোতলীকরণ খরচ প্রতি কেজিতে ১৯ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণের আবেদন করেছে। পাশাপাশি প্রতি কেজিতে ১ টাকা ৫০ পয়সা টার্নওভার কর এবং ৮ টাকা ১২ পয়সা অর্থায়ন ব্যয় বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছে।
এ ছাড়া এম এস তাহের এন্টারপ্রাইজ, মা এন্টারপ্রাইজ, জামাল এজেন্সি ও উজ্জ্বল ট্রেডার্স নামে চারটি পরিবেশক কোম্পানির আবেদন প্রকাশ করেছে বিইআরসি। আবেদনে প্রতি ১২ কেজি সিলিন্ডারে পরিবেশকের কমিশন ৫০ থেকে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতার কমিশন ৪৫ থেকে ৭০ টাকা করার দাবি রয়েছে।
২৯ অক্টোবরের গণশুনানিতে এসব প্রস্তাব নিয়ে সিদ্ধান্তের পথ খুলবে। তবে শুনানির আগেই বাজারে নির্ধারিত দামের চেয়ে শত শত টাকা বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির অভিযোগ থাকায় ভোক্তাদের প্রশ্ন—দাম বাড়ানোর আগে বাড়তি দামে বিক্রি বন্ধে কার্যকর তদারকি হবে তো?






