কৃষিঋণের লক্ষ্য বাড়ল ৫৪ শতাংশ, বিতরণে পিছিয়ে ব্যাংকগুলো: দুই মাসে মাত্র ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ
কৃষি ও পল্লি খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫৪ শতাংশ বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে লক্ষ্য বাড়ানোর তুলনায় বিতরণে গতি আসেনি। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে, অর্থাৎ জুলাই-আগস্টে, ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে মোট লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
গত অর্থবছরের একই সময়ে বিতরণের হার ছিল ১২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ লক্ষ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিতরণের হার আনুপাতিকভাবে বরং কিছুটা কমেছে — এটাই প্রতিবেদনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে কৃষি ও পল্লি খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা। এক লাফে ২১ হাজার কোটি টাকা লক্ষ্য বাড়ানো হয়েছে।
অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বিতরণ করা হয়েছে ৬ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে বিতরণ করা হয়েছিল ৪ হাজার ৮২৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিতরণ বেড়েছে ২ হাজার ৩২ কোটি টাকা বা ৪২ দশমিক ১১ শতাংশ। তবে লক্ষ্যমাত্রা আরও বেশি বাড়ানোয় মোট লক্ষ্যের তুলনায় বিতরণের হার কমে গেছে।
এর আগের চিত্র অবশ্য এমন ছিল না। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে কৃষি ও পল্লি খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৯ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি। এবার লক্ষ্য আরও বাড়ানো হলেও প্রথম দুই মাসের চিত্রে সে অনুযায়ী অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
ব্যাংকভেদে চিত্রও প্রায় একই রকম। চলতি অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানার বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। প্রথম দুই মাসে এসব ব্যাংক বিতরণ করেছে ২ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ১১ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
অন্যদিকে বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বিতরণ করা হয়েছে ৪ হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা বা ১১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ সরকারি-বেসরকারি উভয় ধরনের ব্যাংকই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, কৃষিঋণ বিতরণ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও ব্যাংকগুলোর আগ্রহ তুলনামূলক কম। কারণ, কৃষির তুলনায় শিল্পসহ অন্যান্য খাতে কম পরিচালন ব্যয়ে বেশি মুনাফা করার সুযোগ রয়েছে। এই আগ্রহের ঘাটতিই বিতরণ পিছিয়ে থাকার বড় কারণ বলে মনে করছেন তাঁরা।
বর্তমানে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণস্থিতির মাত্র ২ দশমিক ৯৫ শতাংশ কৃষি খাতে রয়েছে। এ অবস্থায় চলতি অর্থবছর থেকে ব্যাংকের মোট ঋণের অন্তত ৪ শতাংশ কৃষি খাতে বিতরণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আগে এই বাধ্যতামূলক হার ছিল আড়াই শতাংশ।
পর্যায়ক্রমে জিডিপিতে কৃষির অবদানের সমান, অর্থাৎ ১০ শতাংশের বেশি ঋণ এই খাতে বিতরণ বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের। সেই লক্ষ্যের সঙ্গে প্রথম দুই মাসের বিতরণচিত্রের দূরত্ব স্পষ্ট।
কৃষিঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে তদারকি বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য চালু করা হয়েছে ওয়েবভিত্তিক ‘অ্যাগ্রি-ক্রেডিট এমআইএস’ সফটওয়্যার। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর প্রধান কার্যালয় থেকে খাতভিত্তিক ঋণের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে; পরবর্তী সময়ে জেলা পর্যায় থেকেও তথ্য নেওয়া হবে। কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
এদিকে কৃষিঋণ বিতরণের পাশাপাশি খেলাপি ঋণও বেড়েছে। গত আগস্ট শেষে কৃষি খাতে ঋণস্থিতি ছিল ৭০ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ২৯ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৪২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। গত জুন শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ১৮ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা বা ২৯ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১১ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে জারি করা নতুন ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিং নীতিমালার প্রভাব এই বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
তবে আদায়ের দিক থেকে চিত্র কিছুটা ইতিবাচক। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে কৃষি ও পল্লি খাতে ঋণ আদায় হয়েছে ৭ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ৬ হাজার ৭৩ কোটি টাকা। সে হিসাবে আদায় বেড়েছে ১ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা বা ২২ দশমিক ২১ শতাংশ।
সব মিলিয়ে বড় প্রশ্নটি রয়ে গেছে বছরের বাকি সময় নিয়ে: বাধ্যতামূলক ৪ শতাংশ হারের চাপ আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্যের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে কি না, তার ওপরই নির্ভর করবে ৬০ হাজার কোটি টাকার এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের ভাগ্য।






