মুক্তির ফোনের ১৫ দিন পরই ফাঁসি: সৌদিতে সুইটি আক্তারের মৃত্যু ঘিরে গভীর রহস্য
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার নগর ছাওয়ালী গ্রামের এক জীর্ণ কুটিরের উঠানে বসে থাকা বৃদ্ধ ফজল মিয়ার চামড়ায় বয়সের বলিরেখার সঙ্গে মিশে আছে দারিদ্র্যের ছাপ। সারা জীবনের ঘাম আর চোখের পানি দিয়ে টিকিয়ে রাখা তার সংসারের সবচেয়ে ছোট মেয়েটি আজ হাজার মাইল দূরে মরুভূমির দেশে — তার নাম সুইটি আক্তার। অভাবের তাড়নায় বাবার কাঁধের বোঝা একটু হালকা করতে সাড়ে তিন বছর আগে সে পাড়ি জমিয়েছিল সৌদি আরবে।
বাবা-মায়ের আশা ছিল, মেয়ের পাঠানো টাকায় সংসারের চাকাটা একটু ঘুরবে। প্রথম কয়েক মাস টাকা পাঠিয়েছিলও সে। কিন্তু তারপর হঠাৎ একদিন ফজল মিয়ার ফোন বেজে ওঠে — ওপার থেকে ভেসে আসা সুইটির কণ্ঠে কোনো স্বস্তি ছিল না, ছিল রুদ্ধশ্বাস আতঙ্ক। সুইটি জানিয়েছিল, সে কারাগারে। পরিবার জেনেছিল, অন্য নারী কর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে তাকে ফাঁসানো হয়েছে।
এরপর কেটে যায় এক দীর্ঘ, গুমোট বছর। মাসের পর মাস কোনো যোগাযোগ নেই। তারপর আবার ফোন আসা শুরু হয় — মাসে হয়তো একবার। সেই ফোনালাপে কোনো স্পষ্ট উত্তর মিলত না, মিলত কেবল মুক্তির এক ক্ষীণ আশা। সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাটি ঘটে গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে। সুইটি বাবাকে ফোন করে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছিল — "বাবা, আর দুটা মাস। দুই মাসের মধ্যেই আমি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে যাব।" তার হয়ে নাকি একজন আইনজীবী লড়ছেন।
সেই ফোনকলের মাত্র ১৫ দিন পর, ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ঘোষণা এলো — মক্কা অঞ্চলে দুজন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সেই তালিকায় জ্বলজ্বল করছিল একটি নাম: সুইটি আক্তার। অপরজন নজরুল ইসলাম। সৌদি ঘোষণা অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদের ভেতরে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়ে তাদের এই সাজা কার্যকর করা হয়। যে মেয়েটি ১৫ দিন আগেও মুক্তির ক্ষণ গুনছিল, তাকে হঠাৎ কেন ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়া হলো — এই প্রশ্নই আজ পুরো ঘটনাকে রহস্যের চাদরে মুড়ে দিয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টারের এক অনুসন্ধানে এই মৃত্যুদণ্ডের পেছনের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা আরও চাঞ্চল্যকর। অনুসন্ধানে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের একটি অতি গোপনীয় মেমো বা নথি হাতে এসেছে। সেই নথি অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর জেদ্দা কনস্যুলেট পশ্চিমাঞ্চলীয় সৌদি কারাগারগুলোতে থাকা বন্দিদের একটি তালিকা পেয়েছিল — তাতে ৩০৬ জন বাংলাদেশির নাম ছিল, যার মধ্যে নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তারের নামও ছিল। তালিকায় নজরুলের আটক দেখানো হয়েছিল ২০২৩ সালের ১ আগস্ট, সাইবার অপরাধ আইনের আওতায়; ঠিক পরদিন সুইটিকে আটক দেখানো হয় ব্যভিচারের অভিযোগে। কিন্তু তালিকার ১৪৭ জনের নামের পাশে এক মাস থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত সাজার মেয়াদ উল্লেখ থাকলেও নজরুল বা সুইটি — কারও নামের পাশেই মৃত্যুদণ্ডের কোনো উল্লেখ ছিল না। এমনকি তাদের ঠিক কী সাজা দেওয়া হয়েছে, সেটিও পরিষ্কারভাবে লেখা ছিল না। অর্থাৎ কনস্যুলেটের খাতায় যাদের সাজার সুস্পষ্ট তথ্যই ছিল না, তাদেরই ১৪ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেল।
রহস্য আরও ঘনীভূত হয়েছে দুজনের সম্পর্ক ঘিরে। সৌদি ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরুল ও সুইটিকে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু নজরুলের বাবা আব্দুল বশীর গণমাধ্যমকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন — সুইটি তার ছেলের স্ত্রী তো দূরের কথা, তাদের পরিবার সুইটিকে চিনতই না; তারা শুধু শুনেছেন, নজরুল ও সুইটি হয়তো একই জায়গায় কাজ করতেন। অন্যদিকে সুইটির মা জোহরা বেগম জানিয়েছেন, তার মেয়ের আগে একবার বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু সেই সংসার টেকেনি; এরপর সুইটি আর বিয়ে করেননি — তার কোনো স্বামী বা সন্তান নেই। তাহলে সৌদি বিচার প্রক্রিয়ায় তাদের সম্পর্ক কীভাবে উপস্থাপন করা হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখন ছবি নিয়ে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর সৌদি কর্তৃপক্ষ যে নারীর ছবি প্রকাশ করেছে, সেই মুখের সঙ্গে সুইটির মা-বাবা নিজেদের মেয়ের কোনো মিলই খুঁজে পাচ্ছেন না। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় পরিচয়পত্র ও বিদেশযাত্রার ছাড়পত্রের ভিত্তিতে ওই নারীকে সুইটি আক্তার হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু একজন মা সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বলছেন — ওই ছবি তার মেয়ের নয়। জানা গেছে, সৌদি আরবে অনেকেই সুইটিকে "সীতি" নামে চিনত। নামের এই সূক্ষ্ম মিল কি তবে কোনো ভয়াবহ পরিচয়-গোলযোগের ইঙ্গিত দিচ্ছে — সেই প্রশ্ন এখন পরিবারের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
এই ঘটনার পর জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট ও সৌদি কর্তৃপক্ষের মধ্যে টানাপোড়েনও সামনে এসেছে। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল কঠিন কিছু প্রশ্ন তুলেছেন — এই দুই বাংলাদেশিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো আইনি সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না; মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারকে আগে থেকে জানানো হয়নি কেন; আর নিয়মিত বন্দি তালিকায় মৃত্যুদণ্ডের তথ্য লুকিয়ে রাখা হলো কেন। বাংলাদেশ সরকার এখন মামলার বিস্তারিত তথ্য, বিচার প্রক্রিয়ার নথি ও মৃত্যুদণ্ডের বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে নতুন করে কূটনৈতিক নোট (নোট ভার্বাল) পাঠিয়েছে।
কিন্তু এই চিঠি-চালাচালি হারানো দুটি প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারবে না। পুরো ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন একজন মা — জোহরা বেগম। পরিবারের অভাব মেটাতে যে মেয়ে যৌবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো বিসর্জন দিয়ে মরুভূমির দেশে গিয়েছিল, তার এই পরিণতি মেনে নেওয়া তার জন্য অসম্ভব। "বাপে এখনো মাটি কেটে খায়... আমি কইছি মা, লাগব না — বুইরা বাপে কাম করে, আমি বিদেশ যামু" — মেয়ের সেই কথাগুলো আজও কাঁদায় মাকে। তিনি বিচার চান না, ক্ষতিপূরণও চান না। তিনি শুধু জানতে চান — তার মেয়ে আসলে কোথায়, তার সত্যিকারের পরিণতি কী হয়েছিল। পরিবারকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি; এমনকি সুইটি সত্যিই মারা গিয়ে থাকলে তার লাশ কোথায়, সেটিও তারা জানে না।
গোপন নথিতে লুকিয়ে থাকা তথ্য, শেষ ফোনকলের মুক্তির আশা, প্রকাশিত ছবির সঙ্গে চেহারার অমিল আর স্বামী-স্ত্রীর পরিচয় নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি — সব মিলিয়ে সুইটি আক্তারের ঘটনা আজ এক অমীমাংসিত রহস্য। সুইটি কি সত্যিই ফাঁসির মঞ্চে উঠেছিলেন, নাকি নামের সূক্ষ্ম মিলের সুযোগে অন্য কারও অপরাধের দায় গিয়ে পড়েছে তার কাঁধে — এই প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি। টাঙ্গাইলের সেই জীর্ণ কুটিরের উঠানে বসে জোহরা বেগমের নির্ঘুম রাতগুলো শুধু একটি সত্যের অপেক্ষায় — তার মেয়ের শেষ পরিণতিটা অন্তত তিনি জানতে চান।





