‘ভয়াবহ চক্রান্ত’ থেকে রক্ষা পেয়েছি, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শই ছিল সেরা: পদত্যাগের পর বললেন ইশরাক
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সদ্য পদত্যাগ করা ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন বলেছেন, তিনি একটি সুসংগঠিত ও ভয়াবহ চক্রান্তের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছেন। বৃহস্পতিবার নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া পদত্যাগের নির্দেশ প্রথমে তার কাছে ‘শাস্তি’ মনে হলেও পরে তিনি বুঝতে পেরেছেন, ওই সিদ্ধান্তের পেছনে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষার বিষয়টিই ছিল।
ইশরাক লিখেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দিয়ে এযাবৎকালের সেরা পরামর্শটি দিয়েছিলেন, যা আমি একবাক্যে মেনে নিয়েছিলাম।’ পদত্যাগের সময় তিনি বিএনপি ও সরকারের সম্মান রক্ষার কথা বললেও পরবর্তী ফেসবুক পোস্টে প্রধানমন্ত্রীর ওই নির্দেশকে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য ‘এযাবৎকালের সেরা পরামর্শ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ঘটনার সূত্রপাত গেণ্ডারিয়ায় অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর। ভিডিওগুলো প্রকাশের পর তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়, আর এর পরপরই প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিলে সোমবার (১৯ অক্টোবর) তিনি পদত্যাগ করেন। একজন জনপ্রতিনিধি এভাবে অস্ত্র হাতে অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কি না—সেই প্রশ্নই তখন সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
নিজের ফেসবুক পেজে গেণ্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানের একাধিক ভিডিও প্রকাশ করেন ইশরাক হোসেন নিজেই। ওই ভিডিওতে গেণ্ডারিয়ার রেললাইনের পাশের একটি এলাকায় তাকে অস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নিতে দেখা যায়। তার সঙ্গে থাকা আরেক ব্যক্তির হাতেও অস্ত্র দেখা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে কয়েকজনকে হাতকড়া পরিয়ে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে যেতে দেখা যায়।
অবিভক্ত ঢাকা সিটির শেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকার বড় ছেলে ইশরাক লিখেছেন, ‘আমি একটি কঠিন কাজ (মাদকবিরোধী) শুরু করতে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে সূত্রপাত হওয়া এক ভয়াবহ চক্রান্ত থেকে নিজেকে পাশ কাটিয়ে রক্ষা করতে পেরেছি।’ তার ভাষ্য, চক্রান্তটি ছিল তাকে ধারাবাহিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার পরিকল্পনা।
পদত্যাগী প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে ‘একটার পর একটা বিধ্বংসী প্রতিবেদন ও মিথ্যা প্রচারণা’ চালিয়ে চরিত্রহনন এবং জনগণের সমালোচনার মুখে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পাশাপাশি শুভাকাঙ্ক্ষী জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি করে তাকে ‘একঘরে’ করার চেষ্টা হতে পারত।
এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হলে তাকে রাজনৈতিক জীবনের ‘ইতি টানতে হতো’ বলেও পোস্টে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ইশরাক। তিনি বলেন, ‘একই চক্র অতীতে তাঁর (তারেক রহমান) বিরুদ্ধে কী ভয়াবহ অন্যায় পরিকল্পনা করেছিল, সেটাও তিনি মনে করিয়ে দিয়েছিলেন।’ অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী তাকে অতীতের উদাহরণ টেনে সতর্ক করেছিলেন বলেই তার দাবি।
বিএনপির কেউ সুযোগসন্ধানী হয়ে কথিত ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইশরাক। তিনি বলেন, ‘আমরা ঢাকার মানুষ, ক্ষেত খামারির কূটচাল এখানে চলবে না।’ এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি দলের ভেতরের কোনো অংশের দিকেও পরোক্ষ ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
নিজেকে বিএনপি চেয়ারম্যানের প্রতি ‘অন্ধ বিশ্বাস রাখা একজন কর্মী’ বর্ণনা করে ইশরাক লিখেছেন, ‘আল্লাহর রহমতে দেশনায়ক তারেক রহমান আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহের চোখে দেখেন এবং সবসময় আমার জন্যে কোনটা ভালো সেটি চিন্তায় রাখেন। যার প্রমাণ আমি জীবনে বার বার পেয়েছি।’ নিজের বক্তব্যকে কেবল সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া একটি ‘স্ট্যাটাস’ হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘আমি শুধু অবাক হয়ে কয়েক দিন আগে বলা তাঁর (প্রধানমন্ত্রী) কথাগুলোর সঙ্গে আজকের পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখছি।’
এই প্রসঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনের অকার্যকরতার কারণেই ইশরাক হোসেন অস্ত্র প্রদর্শন করতে বাধ্য হয়েছেন। তার ভাষ্য, ‘শুধু তার পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে, সরকারের এমন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।’ তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সীমান্ত সুরক্ষার ব্যর্থতার কথাও তুলে ধরে প্রশ্ন তোলেন, ইশরাকের পদত্যাগ কি শুধু অস্ত্র সামনে আসার বিষয়, নাকি এর সঙ্গে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলেরও কোনো বিষয় রয়েছে।
পদত্যাগের দিন জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক বলেছিলেন, তিনি কোনো ধরনের জমি দখল বা চাঁদা তুলতে যাননি, মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। তার ভাষ্য, গেণ্ডারিয়ার রেললাইনসংলগ্ন ঘুণ্টিঘর এলাকা দীর্ঘদিন ধরে মাদকের আস্তানা হিসেবে গড়ে উঠেছে; বিষয়টি নিয়ে ঢাকার আইনশৃঙ্খলা বৈঠকে একাধিকবার আলোচনা হলেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, ওই এলাকায় পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের চেষ্টা করেও তিনি সফল হননি।
ইশরাকের বর্ণনা অনুযায়ী, স্থানীয়দের অনুরোধে তিনি শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে ঢাকা-৬ আসনে মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেন এবং বিভিন্ন এলাকায় অভিযানে যান, যা পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের পরে জানান। আগস্টে ঘুণ্টিঘর এলাকায় মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই গ্রুপের সংঘর্ষে তিনজন আহত হয়েছিলেন। অভিযানের দিন ঘটনাস্থলে পৌঁছালে ২০-৩০ জন মাদক কারবারি ছোটাছুটি করতে থাকে, কয়েকজন তার গাড়ির দিকে ছুটে আসে; এ সময় আত্মরক্ষার্থে তিনি তার লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্রটি হাতে নেন, এবং তাদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই নিশ্চিত হলে অস্ত্রটি পকেটে রেখে দেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন প্রায় ৪৫ মিনিটের অভিযানে কয়েকটি কক্ষে প্রবেশ করে পুলিশের সহযোগিতায় দেশীয় অস্ত্র, হেরোইনসহ নানা ধরনের মাদক উদ্ধার করা হয় এবং পুলিশ ছয়জনকে আটক করে। কিন্তু রাতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভিডিওটি বিভিন্ন হেডলাইনে প্রকাশ করে তাকে ও তার দলকে বিব্রত করা হয়েছে এবং ঘণ্টায় ঘণ্টায় তার নামে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আলোচনার পর, দল বিব্রত হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করতে চান। তিনি বলেন, ‘আমি সেদিন কোনো ভুল করিনি। শুধু আমার নিরাপত্তার জন্য কিছু সময় আমার অস্ত্রটি হাতে রেখেছিলাম।’
পদত্যাগের পর বৃহস্পতিবারের এই পোস্টে ইশরাকের বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। একদিকে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে নিজের জন্য সেরা পরামর্শ বলছেন, অন্যদিকে ‘ভয়াবহ চক্রান্ত’ আর দলের ভেতরের সুযোগসন্ধানীদের নিয়ে তার ইঙ্গিত নতুন প্রশ্ন তুলছে। এখন দেখার বিষয়, তার এই বক্তব্যের পর দল ও সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া আসে কি না, আর মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে তার ঘোষিত লড়াই কোন পথে এগোয়।



