ডেঙ্গু চিকিৎসার হাসপাতালই হতে পারে সংক্রমণ ছড়ানোর উৎস, নোবিপ্রবির গবেষণায় সতর্কবার্তা
ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত হাসপাতালগুলোই এই রোগের সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাব্য ‘হটস্পট’ বা উৎস হয়ে উঠতে পারে—এমন সতর্কবার্তা উঠে এসেছে এক গবেষণায়। আইজিআই গ্লোবাল প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা গ্রন্থে প্রকাশিত এই গবেষণায় ঢাকার দুটি হাসপাতাল এলাকার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হাসপাতালের কাছাকাছি বসবাসকারীদের মধ্যে ডেঙ্গু শনাক্তের হার বেশি।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) গবেষকেরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের গবেষক ফাহমিদা আলম বিন্তু, মুরাদ হোসেন রাজু ও আয়েশা ইবনাত এই গবেষণা করেন। ঢাকার বড় মগবাজারের ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসংলগ্ন এলাকার ওপর ভিত্তি করে গবেষণাটি করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষের মধ্যে ডেঙ্গু শনাক্তের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। হাসপাতাল থেকে দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আক্রান্তের সংখ্যাও কমতে থাকে। তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতাল থেকে প্রতি ১০০ মিটার দূরত্ব বাড়লে ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৫ শতাংশ কমে যায়।
গবেষকদের মতে, এই চিত্রের পেছনে দুটি কারণ থাকতে পারে। প্রথমত, হাসপাতালের কাছাকাছি বসবাস করলে মানুষের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো এবং ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার সুযোগ বেশি থাকে। দ্বিতীয়ত, উদ্বেগের বিষয় হলো ‘হসপিটাল অ্যামপ্লিফিকেশন’ বা হাসপাতালকে কেন্দ্র করে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।
ডেঙ্গু মৌসুমের চরম সময়ে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে গেলে মশার কামড় থেকে রোগীদের সুরক্ষিত রাখার প্রাথমিক ব্যবস্থাগুলো—যেমন মশারি ব্যবহার ও জানালায় নেট লাগানো—অনেক সময় উপেক্ষিত হয়। অথচ ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তি অসুস্থতার প্রথম এক সপ্তাহ মশার মাধ্যমে ভাইরাস ছড়াতে পারেন। এই সময়ের মধ্যে সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে হাসপাতাল থেকেই নতুন সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়।
এ অবস্থায় হাসপাতালের মশা আক্রান্ত রোগীকে কামড়ে ভাইরাসবাহী হয়ে উঠতে পারে। পরে সেই মশা হাসপাতালের চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, দর্শনার্থী এবং আশপাশের বাসিন্দাদের কামড়ালে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। অর্থাৎ চিকিৎসা নিতে আসা রোগীকে কেন্দ্র করেই চারপাশের সুস্থ মানুষের আক্রান্ত হওয়ার একটি শৃঙ্খল তৈরি হতে পারে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, কোনো ব্যক্তির পাশের বাড়ির প্রতিবেশী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তার নিজের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। গবেষকদের মতে, এই ফল এডিস মশার স্বল্প দূরত্বে ওড়ার বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। মশা বেশি দূর উড়তে পারে না বলেই আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি থাকা মানুষের ঝুঁকি এতটা বেশি থাকে।
এ ছাড়া মুগদা এলাকার গবেষণায় স্থানীয় ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও নির্মাণকাজের কারণে জমে থাকা পানিকে দূরবর্তী এলাকায় নতুন ডেঙ্গু হটস্পট তৈরির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র, আর নির্মাণাধীন এলাকাগুলোতে এমন পানি জমে থাকা প্রায় নিয়মিত ঘটনা।
গবেষণায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর চালানো জরিপে দেখা গেছে, ডেঙ্গু প্রতিরোধে তাদের সচেতনতা ও জ্ঞান ভালো হলেও ব্যক্তিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। অর্থাৎ জানা থাকলেও বাস্তবে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না—এই ব্যবধানই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গবেষকদের পরামর্শ, হাসপাতালকে শুধু চিকিৎসার স্থান হিসেবে বিবেচনা করলেই চলবে না; সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাব্য উৎস হিসেবেও চিহ্নিত করে সেখানে মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীদের সার্বক্ষণিক মশারির ভেতরে রাখা এবং হাসপাতালের আশপাশে নিয়মিত লার্ভিসাইড স্প্রে করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
গবেষণার এসব পর্যবেক্ষণ হাসপাতাল ও আশপাশের এলাকায় মশা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। হাসপাতালের আশপাশে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমাতে মশারি ব্যবহার ও জমে থাকা পানি অপসারণ জরুরি বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হাসপাতালগুলোই ডেঙ্গু ছড়ানোর অন্যতম উৎস—এমন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গবেষণার পদ্ধতি, নমুনা ও সীমাবদ্ধতা বিবেচনা করা জরুরি বলে মত রয়েছে।
দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ যখন প্রতিদিনই নতুন রোগী ও মৃত্যুর খবর দিচ্ছে, তখন এই গবেষণা প্রতিরোধব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বল জায়গার দিকে আঙুল তুলল। চিকিৎসার কেন্দ্রগুলোকে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রে পরিণত করা গেলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বড় অগ্রগতি আসতে পারে। এখন দেখার বিষয়, গবেষকদের এই পরামর্শ হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় কতটা বাস্তবায়িত হয়।





