লুটপাটে বিধ্বস্ত ফ্রান্স: ‘দেশ বাঁচানোর শেষ সুযোগ’ ম্যাক্রোঁর সামনে, সতর্ক করলেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী
গত সপ্তাহের সহিংস বিক্ষোভে পরিবারের ১৫টি দোকান লুটপাটের শিকার হয়েছেন, যার পাঁচটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে — এমন এক ফরাসি ব্যবসায়ী প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে সতর্ক করে বলেছেন, আসন্ন শনিবারের বিক্ষোভই হতে পারে ফ্রান্সের জন্য সিদ্ধান্তমূলক মুহূর্ত। তাঁর ভাষায়, শনিবারই ম্যাক্রোঁর হাতে দেশকে বাঁচানোর শেষ সুযোগ; যা করা দরকার, তা না করলে ফ্রান্সের জন্য সব শেষ হয়ে যাবে।
ব্যবসায়ী মিশেল তেবুল ফক্স নিউজ ডিজিটালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেছেন। তিনি শুধু প্রেসিডেন্টকেই নয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজকেও উদ্দেশ করে বলেন, আগামী শনিবার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে ফ্রান্স হারিয়ে যাবে বলে তিনি মনে করেন।
তেবুলের পরিবারের খুচরা ব্যবসা রয়েছে প্যারিস, বোর্দো, লিয়ঁ, মার্সেই ও মঁপেলিয়ে শহরে। তাঁর ছেলেরাও একই কোম্পানিতে কাজ করেন এবং নিজেদের আলাদা ব্র্যান্ড পরিচালনা করেন। লুটেরাদের হাত থেকে রক্ষা পেতে বোর্ডিং দিয়ে যে সুরক্ষাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তা যথেষ্ট হয়নি — হামলাকারীরা কুড়াল দিয়ে সেই বাঁধ ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে বলে তিনি জানান।
তাঁর ভাষায়, পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি দোকান লুট হয়ে পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু পণ্য নয়, সরকার তাঁদের সুরক্ষা দিতে পারবে — এই আস্থাও তিনি হারিয়েছেন বলে সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন। কর্তৃপক্ষ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষায় পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলো মেরামত করে বীমা কোম্পানির নির্ধারিত নিরাপত্তামান পূরণ করতে অন্তত দুই মাস সময় লাগবে বলে জানান তেবুল। বীমা সুবিধা পাওয়ার শর্ত হিসেবে সেই মান পূরণ বাধ্যতামূলক হওয়ায় দোকান আবার চালু করা ও ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার পথে এটি আরেকটি বড় বাধা। ‘শীতের মৌসুমটা শেষ হয়ে গেছে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকার সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছে বলে জানান এই ব্যবসায়ী; তবে সেটি বাস্তবে কতটা মিলবে, তা নিয়ে অপেক্ষায় আছেন তিনি। তাঁর ছেলেরা কুকুরসহ নিরাপত্তারক্ষী নিয়োগ দিয়েছেন। অন্য কিছু দোকানদার অস্ত্র বা কাঁদানে গ্যাস কিনেছেন বলেও শুনেছেন তিনি, তবে তাঁর ছেলেরা কোনো অস্ত্র কেনেননি বলে জোর দিয়ে বলেন তেবুল। ‘কেউ কেউ অস্ত্র কিনেছে। জানেন তো, ফ্রান্সে আমরা অস্ত্রে অভ্যস্ত নই’ — বলেন তিনি।
তেবুলের অভিযোগ, গত শনিবারের অশান্তির সময় পুলিশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে; বিশেষ করে মার্সেই ও লিয়ঁ শহরের কেন্দ্রে বিপুল জনসমাগমে পুলিশ সদস্যরা হিমশিম খেয়েছেন। মার্সেই শহরের কেন্দ্রে প্রায় ৩০ হাজার তরুণ জড়ো হয়েছিল বলে একটি হিসাবের কথা তিনি উল্লেখ করেন, যদিও সেই সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। অপরদিকে ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম বিএফএম প্রসিকিউটরের হিসাব উল্লেখ করে জানিয়েছে, মার্সেই শহরের কেন্দ্র লুটপাটে জড়িত ছিল ১ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার মানুষ।
ফরাসি সরকার নিজেও অশান্তি মোকাবিলায় ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেছে। তেবুল বলেন, কর্তৃপক্ষ হুমকিটিকে সাধারণ একটি বিক্ষোভ মনে করে ভুল করেছে; তারা চাইলে এই সহিংসতা ঠেকাতে পারত।
তিনি শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ আর সেই সুযোগে লুটপাট চালানোদের মধ্যে পার্থক্যও টেনেছেন। তাঁর ভাষায়, শনিবার দুটি ঘটনা ঘটেছে — বিক্ষোভকারীদের ভিড়ের সুযোগ নিয়ে লুটেরারা শহরের কেন্দ্রে নেমে এসেছিল। লুটেরাদের নজর ছিল রাস্তার ফ্যাশন পণ্য ও দামি সামগ্রীর দিকে।
তেবুল নিজে ইহুদি এবং ফ্রান্সের ইহুদি প্রতিষ্ঠানগুলোর ছাতা সংগঠন ক্রিফের সাবেক পরিচালক। তিনি বলেন, অনেক ইহুদি ফ্রান্স ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবছেন এবং পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সেই অনিশ্চয়তা আরও গভীর হবে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, গত শনিবারের সহিংসতা শুধু ইহুদিদের সমস্যা নয় — পুরো ফ্রান্সই এই সমস্যায় জর্জরিত।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে গত ১৭ ও ১৮ অক্টোবর ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যার কোনো কোনো অংশ সহিংস রূপ নেয়। প্যারিস ও মার্সেইয়ে লুট হওয়া দোকান আর ধ্বংসাবশেষে ঢাকা সড়কের ছবি সেই অশান্তির মাত্রা তুলে ধরে।
তেবুলের কাছে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো — কর্তৃপক্ষ তাঁর পরিবারের অবশিষ্ট জীবিকা ও দেশের সব মানুষকে রক্ষা করতে পারবে কি না এবং ফ্রান্সে নিরাপত্তার অনুভূতি ফিরিয়ে আনতে পারবে কি না। তাঁর সরল কথা: ‘আমাদের নিরাপদ বোধ করতে হবে।’ আসন্ন শনিবারের বিক্ষোভকে ঘিরে তাই সবার চোখ এখন ফরাসি সরকারের প্রস্তুতির দিকে।




