মধ্যবর্তী নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ কানাডার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছে, কানাডার রাজনীতিকরা দেশটির আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রভাব ফেলার চেষ্টা করছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক অভিযানের বিরুদ্ধে কানাডার পাল্টা পদক্ষেপগুলোকেই এই অভিযোগের ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বুধবার প্রকাশিত এক তথ্যপত্রে (ফ্যাক্ট শিট) যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস বলেছে, নির্বাচনে হস্তক্ষেপের উদ্বেগকে কানাডা সরকার হালকাভাবে নিচ্ছে। তথ্যপত্রে বলা হয়, ‘কানাডা সরকার সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ উড়িয়ে দিচ্ছে, অথচ এর মন্ত্রী ও প্রিমিয়াররা সরকারি নথি ও জনসমক্ষে আমেরিকান রাজনীতিতে প্রভাব ফেলার পরিকল্পনার কথা খোলাখুলি বর্ণনা করছেন।’
২০২৫ সালে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকেই দুই দেশ বাণিজ্যযুদ্ধে জড়িয়ে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের জবাবে কানাডাও নিজস্ব আমদানি কর বসিয়েছে। তবে মার্কিন দূতাবাসের দাবি, শুল্ক নিয়ে কানাডীয় কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য বক্তব্য আসলে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা।
তথ্যপত্রে বিশেষভাবে নাম এসেছে কানাডার শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলির। আগস্টে ট্রাম্পের শুল্কের জবাব নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা এমন পণ্যকে লক্ষ্য করছি, যা যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট অঙ্গরাজ্যগুলোকে প্রভাবিত করবে। রাজনৈতিক চাপ তৈরির ক্ষেত্রে আমরা বিজ্ঞ ও কৌশলগতভাবে এগোচ্ছি।’ দূতাবাস এই মন্তব্যকেই অভিযোগের অন্যতম ভিত্তি করেছে।
সেপ্টেম্বরে বোস্টন ও শিকাগোতে ডেমোক্র্যাট কর্মকর্তাদের সঙ্গে জোলির বৈঠক নিয়েও আপত্তি তুলেছে দূতাবাস। এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে জোলি বলেছিলেন, ডেমোক্র্যাটরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে জিতলে শুল্কের বিষয়ে কী হতে পারে — ‘ঠিক এ কারণেই আমি এত গভর্নর ও সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর সঙ্গে বৈঠক করছি।’
তবে জোলি এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর ভাষায়, কানাডা কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে নাক গলাবে না। তিনি বলেন, ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান — উভয় দলের রাজনীতিকদের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের উদ্দেশ্য ছিল কানাডার অর্থনীতির জন্য বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা। ১৪ অক্টোবর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘মূলত আমি যুক্তরাষ্ট্রে যা করেছি, তা হলো বিনিয়োগ আনা।’
তথ্যপত্রে অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ডের কথাও এসেছে — মার্কিন পণ্যের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থার আহ্বান এবং তাঁর সরকারের শুল্কবিরোধী বিজ্ঞাপন প্রচার। ১৯৮৭ সালের এক রেডিও ভাষণে শুল্কের সমালোচনা করা সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের ক্লিপ ব্যবহার করে তৈরি সেই বিজ্ঞাপনের জেরে ২০২৫ সালের অক্টোবরে ট্রাম্প কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
তবে সমালোচকদের চোখে, দূতাবাসের তথ্যপত্রে কানাডীয় কর্মকর্তাদের বাণিজ্যনীতি প্রভাবিত করার নানা উদাহরণ থাকলেও, সেগুলো কীভাবে ‘নির্বাচনে হস্তক্ষেপ’ হয়, তার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
অভিযোগের আরেকটি উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, লিবারেল এমপি অ্যান্থনি হাউসফাদার ফ্লোরিডায় ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ডেবি ওয়াসারম্যান শুল্টজের পক্ষে তাঁর আগস্টের প্রাইমারি নির্বাচনের আগে প্রচার চালিয়েছিলেন।
তথ্যপত্রে পৃথকভাবে ১১ জন কানাডীয় নাগরিকের নামও উল্লেখ করা হয়েছে, যাঁরা ২০১২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ভোট দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত বা দণ্ডিত হয়েছেন। তবে এই নাগরিকদের সঙ্গে কানাডা সরকারের কোনো পরিকল্পনার যোগসূত্রের প্রমাণ তথ্যপত্রে উপস্থাপন করা হয়নি।
দূতাবাসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সব কানাডীয়ের উচিত যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে কোনোভাবে অংশ নেওয়া বা প্রভাব ফেলার চেষ্টা থেকে বিরত থাকা। আমেরিকার নির্বাচনের সিদ্ধান্ত আমেরিকানরাই নেয়।’
এই তথ্যপত্র প্রকাশের এক সপ্তাহ আগেই কানাডায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিট হোয়েকস্ট্রা বলেছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে হস্তক্ষেপের লক্ষণ দেখতে ওয়াশিংটন কানাডাকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। কানাডিয়ান প্রেসের বরাতে এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমরা পর্যবেক্ষণ করছি, মূল্যায়ন করছি; এর কোনোটি নির্বাচনী হস্তক্ষেপে পরিণত হলে আমেরিকা তার জবাব দেবে।’
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা দীর্ঘদিনের মিত্র হলেও ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফেরার পর সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে। বাণিজ্যযুদ্ধের পাশাপাশি তিনি বারবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর হুমকিও দিয়েছেন। সম্প্রতি এমন খবরও এসেছে যে, এই সপ্তাহে ব্যর্থ হওয়া স্বাধীনতা গণভোটের আগে আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সমর্থন চেয়েছিলেন।
সোমবারের প্রাদেশিক ভোটের আগে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগের জবাবে বলেন, বিদেশি সরকারগুলো কানাডার নির্বাচন থেকে দূরে থাকবে — এটাই প্রত্যাশা। গ্লোবাল নিউজকে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা একেবারে স্পষ্ট: আমরা তাদের নির্বাচনে জড়াই না, তারাও আমাদের নির্বাচনে জড়াবে না।’ এই অভিযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডা, প্রিমিয়ার ফোর্ড ও মন্ত্রী জোলির দপ্তরের মন্তব্য চাওয়া হয়েছে।






