বোর্নিওতে পুড়ছে বন, বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: অসুস্থ লাখো মানুষ
ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও দ্বীপে মাসের পর মাস ধরে জ্বলতে থাকা বনাগ্নি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশাল এলাকা বিষাক্ত ধোঁয়ায় (হেজ) আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। এই ধোঁয়ার কারণে এখন পর্যন্ত কয়েক লাখ মানুষ অসুস্থ হয়েছেন, আর সবচেয়ে বেশি ভুগছেন শিশুরা।
মধ্য কালিমান্তানের পালাংকারায়া শহরে বসবাসকারী তিন সন্তানের মা দিয়ানিরা একা নাস্তিতি প্রতি রাতেই ভয়ে থাকেন। তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে রাতে আমার বাচ্চার বুকে ঘড়ঘড় শব্দ হয়। মাত্র দেড় মাস বয়সে সে ব্রঙ্কোনিউমোনিয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। প্রতিটি রাতেই আমি দুশ্চিন্তা করি—আগামীকাল আমার শিশুর কাশি হবে তো?’
স্যাটেলাইট প্ল্যাটফর্ম নুসান্তারা অ্যাটলাসের হিসাব অনুযায়ী, বছরের শুরু থেকে ইন্দোনেশিয়াজুড়ে প্রায় ১৯ লাখ হেক্টর এলাকা পুড়েছে—যা যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্য কিংবা গোটা ফিজি দেশের আয়তনের সমান। শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই পুড়েছে আনুমানিক ১০ লাখ হেক্টর।
জলন্ত বন, জলাভূমি ও পিটভূমির ধোঁয়া বাতাসকে ক্ষুদ্র কণা ও কার্বন মনোক্সাইডে ভরে তুলেছে। এই বিষাক্ত মেঘ ইন্দোনেশিয়া ছাড়িয়ে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইন পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। পিটের ধোঁয়ার ক্ষুদ্র কণা ফুসফুসের গভীরে, এমনকি রক্তপ্রবাহে ঢুকে প্রদাহ, দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ ও অকালমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়।
ইন্দোনেশিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি কাশি ও তীব্র শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ৭৭ হাজার ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা ৬২ হাজারের বেশি।
২২ বছর বয়সী নাতারি ভিক্টোরিয়া এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে কাশিতে ভুগে পালাংকারায়ার একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি হন। তিনি বলেন, ‘বনের আগুন সবার স্বাস্থ্যের ওপর বিশাল প্রভাব ফেলেছে। আমার ছোট ছোট ভাইবোন, এমনকি শিশুরাও কাশছে। এটা সত্যিই তাদের কাবু করে ফেলছে।’
পালাংকারায়া স্বাস্থ্য দপ্তরের প্রধান রিদুয়ান বলেন, শহরের আকাশ হলুদ ও ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে গেছে। তাঁর ভাষায়, বাসিন্দারা আসলে টাটকা অক্সিজেন নয়, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও দূষক শ্বাস নিচ্ছেন—যার ফলে শরীর, বিশেষ করে মস্তিষ্ক, পর্যাপ্ত অক্সিজেন পাচ্ছে না। শিশু, প্রবীণ ও গর্ভবতী নারীরা এই ধোঁয়ার ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি।
কর্তৃপক্ষ ঘরে থাকার পরামর্শ দিলেও বাসিন্দারা বলছেন, তা বাস্তবসম্মত নয়। নাস্তিতির কথায়, বাজার করা, সন্তানদের স্কুলের জিনিস কেনা—এসব কাজে বাইরে যেতেই হয়। তবু ধোঁয়া ঘন হলে তিনি সন্তানদের জোর করে ঘরে আটকে রাখেন; পার্কে খেলার বদলে ওই শিশুদের ঘরবন্দি থাকতে হচ্ছে। পালাংকারায়া থেকে ৫০ কিলোমিটার উত্তরের রামাং গ্রামের বাসিন্দা লোলা মাচিত্রি (৩৭) জানান, তাঁর সন্তানরা অনলাইনে ক্লাস করছে, আর প্রাপ্তবয়স্করা বিষাক্ত বাতাসে অর্ধেক দিনের কাজ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
কৃষক, দিনমজুর ও ছোট বিক্রেতারা জীবিকা বিসর্জন দেওয়া নয়তো ঝুঁকি নিয়ে বাইরে বেরোনোর মধ্যে বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। মাচিত্রির প্রশ্ন, ‘স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে ভয় পাই কি না জিজ্ঞেস করলে বলব, অবশ্যই পাই। কিন্তু আমরা যাবই বা কোথায়? সহ্য করে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’
সরকারের ওপর আগুন থামাতে আরও কিছু করার চাপ বাড়ছে; অনেকেই কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়াকে অত্যন্ত অপ্রতুল বলে সমালোচনা করছেন। কর্তৃপক্ষ বলছে, আকাশ থেকে পানি ছিটানো ও পরীক্ষামূলক আবহাওয়া পরিবর্তনসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে সরকার জানায়, স্থল অভিযানে ৬০ হাজারের বেশি কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে এবং নতুন আগুন নেভাতে ৮০ শতাংশ সাফল্যের দাবি করা হয়েছে।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের দমকলকর্মীদের সম্পদ ফুরিয়ে আসছে। দমকলকর্মী জুনি ১০০ দিনের বেশি সময় ধরে আগুনের সঙ্গে লড়ছেন; ভূপৃষ্ঠের আগুন নিভলেও পিটের গভীরে ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকা আগুন থামছে না। ধোঁয়ায় তাঁর শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী কাশি ও চোখে অসহ্য ব্যথা হয়েছে। তাঁর চাওয়া একটাই—‘বাতাস’। আরেক দমকলকর্মী ফাউজি রহমান বলেন, পিটভূমির আগুন নেভাতে প্রচুর পানি ও দীর্ঘ সময় লাগে; সাধারণ ভূমিতে দল মিলে দিনে ২০ হেক্টর পরিষ্কার করা গেলেও পিটভূমিতে মাসের পর মাস লাগতে পারে, আর এখন পানিই পাওয়া যাচ্ছে না।
এ বছর মৌসুমি বনাগ্নিকে আরও ভয়াবহ করেছে তথাকথিত ‘সুপার এল নিনো’, যা খরা পরিস্থিতি বাড়িয়ে পিটের আগুন নেভানোর জন্য জরুরি বৃষ্টি বিলম্বিত করেছে। বনবিশেষজ্ঞ ও পিটভূমি গবেষক ড. নিসা নোভিতা (ইন্দোনেশিয়ার সংরক্ষণ সংস্থা ওয়াইকেএএন) বলেন, পরিস্থিতি ডুবে যাওয়া জাহাজ বাঁচানোর মতো—জরুরি ভিত্তিতে সব নিরাপদ ও কার্যকর উপায় কাজে লাগাতে হবে। তাঁর দল জানিয়েছে, যেসব এলাকায় আগে কখনো আগুনের ইতিহাস ছিল না, সেখানেও আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। পালাংকারায়ার মানুষের সবচেয়ে বড় আশা এখন ভারী বৃষ্টি।





