পেরুতে নতুন সম্পদের ৪২ শতাংশই শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর হাতে, দরিদ্রতম অর্ধেক মানুষ পেয়েছে মাত্র ১.৪ শতাংশ: অক্সফাম
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সৃষ্ট নতুন সম্পদের ৪২ শতাংশই চলে গেছে দেশটির শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর হাতে। দাতব্য সংস্থা অক্সফামের এক বিশ্লেষণে এই চিত্র উঠে এসেছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, একই সময়ে দেশের দরিদ্রতম ৫০ শতাংশ মানুষের ভাগ্যে জুটেছে নতুন সম্পদের মাত্র ১.৪ শতাংশ। ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে এই বিশাল ব্যবধান দেশটির গভীরতর সামাজিক বিভাজন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
অক্সফাম জানিয়েছে, এই ৪২ শতাংশের হার আগের সময়ের তুলনায় বেড়েছে। ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে শীর্ষ ১ শতাংশ ধনী নতুন সম্পদের প্রায় ৩৯ শতাংশ দখল করেছিলেন; এখন সেই হার আরও বেড়ে গেছে।
পেরুতে অক্সফামের নির্বাহী পরিচালক আলেহান্দ্রা আলায়জা বলেন, ‘পেরুতে অর্থনৈতিক বৈষম্য দশকের পর দশক ধরে অনড়ভাবে উচ্চ রয়ে গেছে। মানুষ যখন মনে করে একই মানুষেরাই সবসময় জেতে, কিছুই বদলায় না এবং কিছুই বদলাতে পারে না, তখন বৈষম্য অন্যায়ের বদলে প্রকৃতির নিয়মের মতো মনে হতে শুরু করে।’
আলায়জা আরও বলেন, ‘এটা এক ধরনের বিপজ্জনক হতাশাবাদ, এবং আমাদের এটা ভেঙে ফেলতেই হবে।’ তাঁর মতে, বৈষম্য প্রকৃতির কোনো শক্তি নয়; এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল, আর ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিলে ভিন্ন পেরু গড়া সম্ভব।
অক্সফাম লিমাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর পেরুভিয়ান স্টাডিজের সঙ্গে মিলে পেরুর মানুষের বৈষম্য-সংক্রান্ত ধারণা নিয়ে এই মাসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। জরিপে দেখা গেছে, ৮৪ শতাংশ পেরুভীয় মনে করেন, তাঁদের দেশ এমন প্রভাবশালী স্বার্থগোষ্ঠীর দ্বারা পরিচালিত হয়, যারা নিজেদের সুবিধামতো রাজনীতিকে গড়ে তোলে।
জরিপে আরও দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা মনে করেন ধনী করপোরেশন ও ব্যক্তিরা তাঁদের ন্যায্য অংশের কর পরিশোধ এড়িয়ে যান। প্রায় ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা চান, সরকার বৈষম্য কমাতে আরও পদক্ষেপ নিক; সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মনে করেন, এই বৈষম্যই স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও ন্যায়বিচারের মতো সেবা পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আলায়জা বলেন, ‘বৈষম্য কমাতে পদক্ষেপের পক্ষে জনসমর্থনের এই অনস্বীকার্য মাত্রা দেখে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই।’ বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই প্রবণতা সরকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনবিশ্বাসের জন্য খারাপ লক্ষণ।
ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের এই চিত্রের পাশাপাশি পেরুতে চলছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদকে কেন্দ্র করে। একের পর এক তদন্ত, কেলেঙ্কারি ও অভিশংসনের জেরে গত ১০ বছরে দেশটি নয়জন প্রেসিডেন্ট দেখেছে।
সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট হিসেবে দক্ষিণপন্থী কেইকো ফুজিমোরি জুলাইয়ে শপথ নিয়েছেন। তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সেই নির্বাচনে ভোটদানে বিলম্ব ও শীর্ষ প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ দেখা গিয়েছিল।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ফেলো উইল ফ্রিম্যান বলেন, ক্ষমতার এমন ঘূর্ণনের মধ্যেও একটি সংকীর্ণ রাজনৈতিক-অপরাধী-ব্যবসায়ী গোষ্ঠীই ব্যাপক ক্ষমতা ধরে রেখেছে — ‘দুটো বিষয়ই পেরুর ক্ষেত্রে সত্য।’ তিনি বলেন, এই গোষ্ঠীগুলো নিজেরা অস্থির ও পরিবর্তনশীল হলেও নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ বা রাজনৈতিক ক্ষমতার পক্ষেই প্রভাব খাটাচ্ছে।
রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি বড় উৎস প্রেসিডেন্সি ও শক্তিশালী কংগ্রেসের সংঘাত। ‘নৈতিক অযোগ্যতা’র মতো অস্পষ্ট ভিত্তিতে কংগ্রেস প্রেসিডেন্টকে অভিশংসন করতে পারে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট পেদ্রো কাস্তিলো অবৈধভাবে কংগ্রেস ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেন; এরপর তাঁকে অপসারণ ও গ্রেপ্তার করা হয় এবং ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর উত্তরসূরি দিনা বোলুয়ার্তের সরকারের মাসব্যাপী দমন-পীড়নে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেও জবাবদিহি প্রায় হয়নি বলেই অধিকার গোষ্ঠীগুলো বলছে।
এরপরের বছরগুলোতে পেরুর সরকার বিচারিক তদারকি দুর্বল করা ও দুর্নীতিবিরোধী নজরদারি সংস্থাগুলোকে খর্ব করার পদক্ষেপও নিয়েছে। গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা মাপা সংস্থা ফ্রিডম হাউস ২০২২ সালে পেরুকে ‘মুক্ত’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করলেও ২০২৩ সালে সেটি নামিয়ে ‘আংশিক মুক্ত’ করা হয়, যা ২০২৬ সালের প্রতিবেদনেও বহাল আছে। সংস্থাটি বলেছে, উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতির কেলেঙ্কারি সরকারের প্রতি জনবিশ্বাস ক্ষয় করেছে এবং বিচারিক স্বাধীনতা দুর্বল হওয়া দেশের শাসন প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।



