আসামে দুই দিনের উচ্ছেদে ঘরছাড়া ১১০০-র বেশি বাঙালি মুসলিম পরিবার, গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ১০ মসজিদ
ভারতের আসাম রাজ্যের নগাঁও, হোজাই ও গোলাঘাট জেলায় বনাঞ্চলীয় ভূমি থেকে দুই দিনের উচ্ছেদ অভিযানে ১ হাজার ১০০টিরও বেশি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই বাংলাভাষী মুসলিম। এই অভিযানের সময় অন্তত ১০টি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কড়া নিরাপত্তার মধ্যে নগাঁওয়ের লুতুমারী লংজাপ সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে গত রোববার ৫০০ থেকে ৬০০টি পরিবারকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
এর আগের দিন নগাঁওয়ে ৩৩৬টি, হোজাইতে ১৫২টি এবং গোলাঘাটে ৫৯টি পরিবারসহ মোট ৫৪৭টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। দুই দিন মিলিয়ে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারের সংখ্যা তাই ১ হাজার ১০০ ছাড়িয়ে গেছে।
উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দা আব্দুল নূর জানান, ঔপনিবেশিক আমলের ‘তাউঙ্গিয়া’ ব্যবস্থার অধীনে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের শ্রমিক হিসেবে কাজ করা তাঁদের পূর্বপুরুষদের ১৯৭১ সালের আগে এই জমিতে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল। অর্থাৎ বাসিন্দাদের দাবি, এই জমিতে তাঁদের বসবাস প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসছে।
গুয়াহাটি হাইকোর্টে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আবেদন করা হলেও আদালত সংরক্ষিত বনাঞ্চল সুরক্ষার স্বার্থে তাঁদের ৩০ দিনের মধ্যে জায়গা খালি করার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশের পরই অভিযান এগিয়ে নেওয়া হয়।
আসাম সরকারের দাবি, সরকারি ও বনাঞ্চলীয় জমি জবরদখলমুক্ত করতেই এই অভিযান চালানো হচ্ছে। সরকারের অবস্থান অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনভূমি দখলমুক্ত করা তাদের নীতিগত সিদ্ধান্তের অংশ।
তবে দাপ্তরিক তথ্য অনুসারে, আসামে বিজেপি সরকারের এক দশকের শাসনামলে সরকারি জমি থেকে প্রায় ১৯ হাজার পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই মুসলিম সম্প্রদায়ভুক্ত। এই পরিসংখ্যানই উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।
দুই দিনের এই অভিযানে এত বিপুলসংখ্যক পরিবারের একসঙ্গে ঘরছাড়া হওয়া এবং ১০টি মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনা স্থানীয়ভাবে গভীর প্রভাব ফেলেছে। উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর সামনে এখন কোথায় যাবেন, সেই প্রশ্নই সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
বাসিন্দাদের বক্তব্য ও সরকারের বক্তব্য একেবারে বিপরীত অবস্থানে দাঁড়িয়ে। একদিকে প্রজন্মের বসতি থেকে উচ্ছেদের অভিযোগ, অন্যদিকে বনভূমি দখলমুক্ত করার সরকারি যুক্তি — এই টানাপোড়েনের মধ্যেই আসামে উচ্ছেদ ইস্যুটি আবার আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী জায়গা খালি করার সময়সীমা ও বনাঞ্চল সুরক্ষার প্রশ্নটি এই অভিযানের আইনি ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তবে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর পুনর্বাসন নিয়ে কী হবে, তা নিয়ে উপলব্ধ তথ্যে স্পষ্ট কোনো ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে, নগাঁও, হোজাই ও গোলাঘাটে দুই দিনের এই উচ্ছেদ আসামের দীর্ঘদিনের ভূমি ও বসতি বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে, যেখানে ১ হাজার ১০০-র বেশি পরিবারের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।





