…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › প্রযুক্তি › খবর
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — আবদুল কুদ্দুস, চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ
প্রযুক্তি

এক বছরে শিশুদের সাইবার হয়রানি বেড়েছে ৪২ শতাংশ, সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশে শিশুদের সাইবার হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত ন্যাশনাল চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এর তথ্য বলছে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে শিশুদের সাইবার হয়রানি-সংক্রান্ত কল বেড়েছে ৪২ শতাংশ—যা শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাতে মোবাইল ফোন পেয়ে শিশুরা অনলাইন জগৎ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। আবার কখনো কখনো অভিভাবকেরাই পড়াশোনা, যোগাযোগ কিংবা বিনোদনের জন্য বয়স বাড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্তানের অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়ে অজান্তেই সাইবার বিপদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছেন।

এমনই এক ঘটনার কথা জানিয়েছেন একটি বহুজাতিক সংস্থার এক কর্মকর্তা। করোনাকালে ২০২০ সালে অনলাইন ক্লাসের জন্য তিনি বয়স বাড়িয়ে মেয়েকে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিলেন; তখন মেয়েটি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত। পরে ওই অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সমবয়সী পরিচয় দেওয়া অপরিচিত এক ব্যক্তির সঙ্গে মেয়েটির বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে কৌশলে ওই ব্যক্তি মেয়েটির পাসওয়ার্ড জেনে অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং আপত্তিকর ছবি-ভিডিও ধারণ করে তাকে ব্ল্যাকমেল করতে শুরু করে।

ভয় ও আতঙ্কে মেয়েটি প্রথমে কাউকে কিছু জানায়নি। মেধাবী মেয়েটি একপর্যায়ে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে, পড়াশোনা থমকে যায়। পরে দীর্ঘদিন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাউন্সেলিংয়ে থেকে সে স্বাভাবিক হয় এবং মাধ্যমিক পাস করে; তবে এখনো মাঝে মাঝে পুরোনো ট্রমা ফিরে আসে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই মেয়েটির মতো অসংখ্য শিশু এমন ঘটনার শিকার হয়ে বিভীষিকাময় সময় পার করছে।

হেল্পলাইনের তথ্যেই এই বৃদ্ধির চিত্র স্পষ্ট। ২০২৫ সালে হেল্পলাইনে মোট ৭ লাখ ৬৯ হাজার ৮৬১টি কল গ্রহণ করা হয়, যার মধ্যে ৫৯৭টি ছিল শিশুদের সাইবার হয়রানি-সংক্রান্ত; এসব কলের মধ্যে ১৭৯টি ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে আসা ৫ লাখ ২৭ হাজার ৯৫৪টি কলের মধ্যে সাইবার হয়রানি-সংক্রান্ত কল ছিল ৫৬৫টি এবং ১৭০টি ক্ষেত্রে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মাসিক গড় হিসাবে, গত বছর প্রতি মাসে সাইবার হয়রানি নিয়ে প্রায় ৫০টি কল আসত; চলতি বছর তা বেড়ে মাসে ৭০টির বেশি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবাণী, এগুলো শুধু হেল্পলাইনে জানানো ঘটনার হিসাব। এর বাইরে শিশুদের সাইবার হয়রানির আরও অনেক ঘটনা ঘটছে, যা হেল্পলাইনে না জানানোয় নথিভুক্তই হয়নি।

হেল্পলাইন ১০৯৮-এর ব্যবস্থাপক চৌধুরী মো. মোহায়মেন বলেন, পরিবারগুলো ভেঙে ছোট হচ্ছে; পরিবারের সদস্যদের বদলে শিশুরা অনলাইনে অপরিচিত মানুষের সংস্পর্শে আসছে। অথচ কে প্রকৃত পরিচয়ে যোগাযোগ করছে আর কে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করছে, তা বোঝার ক্ষমতা তাদের সব সময় থাকে না। অপরাধীরা অনেক সময় শিশুর সমবয়সী পরিচয় দিয়ে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে, পরে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও কিংবা তথ্য সংগ্রহ করে ব্ল্যাকমেলের চেষ্টা করে। তাই সন্তানের অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়ার পর কারা তার বন্ধু হচ্ছে, কী ধরনের বার্তা আসছে এবং কেউ ব্যক্তিগত তথ্য চাইছে কি না—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন থাকা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

ফেসবুক, টিকটকসহ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৩ বছরের কম বয়সে অ্যাকাউন্ট খোলা যায় না। কিন্তু অনেকে বয়স বাড়িয়ে অ্যাকাউন্ট খোলে, আর এসব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে নানা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর সূত্র ধরে শিশুদের ঘর ছাড়ার ঘটনা মাঝে মাঝেই খবরে আসে। সম্প্রতি কুমিল্লায় পঞ্চম শ্রেণিপড়ুয়া তিন শিশু তৃতীয় শ্রেণিপড়ুয়া এক শিশুকে নিয়ে ঘর ছেড়েছিল; পরে তাদের হবিগঞ্জ থেকে উদ্ধার করা হয়। একই জেলায় সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীর মোবাইল ফোনে পরিচয়ের সূত্রে কক্সবাজারে যাওয়া এবং বাড়ি ফেরার পথে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়।

বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশে সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয় না। ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো প্যারেন্টাল গাইডলাইন মেনে চলে না, ফলে শিশুরা কার্টুন দেখার সময় বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রল করার সময় প্রাপ্তবয়স্কদের কনটেন্ট সামনে চলে আসতে পারে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসে ১০০টি পরিবারের ওপর চালানো সংগঠনটির সমীক্ষায় দেখা গেছে, দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৯৫ শতাংশই মুঠোফোনে আসক্ত; এদের প্রায় ৯৫ শতাংশ কার্টুন ও ভিডিও গেম দেখে এবং প্রায় ৫০ শতাংশ টিকটক দেখে।

ঝুঁকির পুরোনো তথ্যও কম উদ্বেগের নয়। ২০১৯ সালে ইউনিসেফ বাংলাদেশ ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১ হাজার ২৮১ শিশুর ওপর জরিপ চালায়। তাতে অংশ নেওয়া ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইনে সাইবার বুলিং, সহিংসতা বা হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানায়; ২৫ শতাংশ শিশু ১১ বছর বয়সের আগেই ডিজিটাল জগতে প্রবেশ করেছিল। একই জরিপে ৭০ শতাংশ ছেলে ও ৪৪ শতাংশ মেয়ে অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তির বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করার কথা জানায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখন হয়রানির শিকার শিশুর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে; অনেক বাবা-মা সন্তানের জন্মদিন, স্কুলে যাওয়া, পুরস্কার গ্রহণ বা দৈনন্দিন ঘটনার ছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন—এই প্রবণতাও পরে শিশুকে বিপদে ফেলতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসার এই ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা সাধারণ পারিবারিক ছবিও এআই ব্যবহার করে নিপীড়নমূলক ছবি বা ভিডিওতে রূপান্তর করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইন্টারনেট ওয়াচ ফাউন্ডেশন ২০২৫ সালে এমন ৩ হাজার ৪৪০টি ভিডিও শনাক্ত করেছে, অথচ ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১৩টি। তাঁর পরামর্শ, অভিভাবকদের প্রথমে বুঝতে হবে—শিশু কোনো কনটেন্ট নয়; অপ্রয়োজনে শিশুর নামে প্রকাশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খোলা উচিত নয়।

বিশেষজ্ঞদের সুপারিশের তালিকায় আছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট ব্যক্তিগত (প্রাইভেট) রাখা, অনুসারীদের তালিকা নিয়মিত যাচাই করা, শক্তিশালী ও আলাদা পাসওয়ার্ড ব্যবহার এবং দ্বিস্তরীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু রাখা। শিশুদের সতর্ক করতে হবে অপরিচিতের পাঠানো লিংকে প্রবেশ, উপহারের প্রলোভন, ভিডিও কলে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব, গোপনে কথা চালানোর অনুরোধ কিংবা ব্যক্তিগত ছবি চাওয়ার বিষয়ে; আর কোনো অনলাইন যোগাযোগে অস্বস্তি বোধ করলে বা কেউ ভয় দেখালে যেন তারা নির্ভয়ে অভিভাবককে জানাতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।

শিশু সুরক্ষায় কাজ করা সংগঠন ‘শিশুরাই সব’-এর আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, সন্তানের মোবাইল ফোন নিয়মিত পরীক্ষা করা কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইন্টারনেট বন্ধ রেখে অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। শিশুকে ব্যক্তিগত তথ্যের গুরুত্ব, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের ঝুঁকি এবং হয়রানির শিকার হলে করণীয় শেখাতে হবে। কোনো ছবি বা তথ্যের অপব্যবহার হলে তাড়াহুড়ো করে সব মুছে না ফেলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট লিংক, ব্যবহারকারীর নাম, বার্তা, স্ক্রিনশট, ঘটনার সময় ও মূল ফাইল সংরক্ষণ করে তারপর প্ল্যাটফর্ম কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাকে জানাতে হবে।

ডিজিটালি রাইট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, শুধু অ্যাকাউন্ট খোলা নিষিদ্ধ করে সমাধান আসবে না; নজরদারির পাশাপাশি দরকার ব্যাপক জনসচেতনতা, প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত অপরাধ তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানো। স্কুলপর্যায় থেকে অনলাইন নিরাপত্তাবিষয়ক শিক্ষা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার তাগিদও দিয়েছেন তিনি। বিশেষজ্ঞদের ঐকমত্য—শিশুদের অনলাইন সুরক্ষায় পরিবার, সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — জাকির হোসেন, সম্ভাব্য ইউপি সদস্য পদপ্রার্থী, ৭ নং ওয়ার্ড, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন

প্রযুক্তি বিভাগের আরও খবর

প্রযুক্তি

পিএইচপির ভয়াবহ নিরাপত্তা ত্রুটি: সাইবার হামলার শঙ্কায় বিশ্বজুড়ে বন্ধ বহু সরকারি ওয়েবসাইট

ওয়েবসাইট তৈরির সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে ধরা পড়েছে দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি। এই ত্রুটির সুযোগ নিয়ে হামলাকারীরা কোনো পাসওয…

প্রযুক্তি

এআইয়ের যুগে লেখকের অস্তিত্বের সংকট: অরুন্ধতী রায়ের উদ্বেগ ও কপিরাইটের লড়াই

এখন মাত্র কয়েক মিনিটেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে লিখিয়ে নেওয়া যায় একটি পূর্ণাঙ্গ ফিচার, গল্প কিংবা প্রবন্ধ। নির্দেশনায় বলা যায়, লেখাটি হো…

প্রযুক্তি

এআই-তৈরি গান নিয়ে শ্রোতাদের অনীহা বাড়ছে, পাঁচ কোটি ‘স্লপ’ গান সরাল স্পটিফাই

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি গানের ঢেউয়ের মুখে শ্রোতা, সংগীতশিল্পী আর স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম — সব পক্ষই এখন সীমারেখা টানতে শুরু করেছে। মঙ্গলবার স্পট…

প্রযুক্তি

ফেসবুকে বদলে যাচ্ছে হিসাবের নিয়ম: ‘রিচ’-এর বদলে আসছে ‘ভিউয়ারস’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কনটেন্টের দর্শকসংখ্যা মাপার চেনা পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসছে। আগামী ৩১ অক্টোবর থেকে কনটেন্টের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণে ‘রিচ’ মে…