এআই-তৈরি গান নিয়ে শ্রোতাদের অনীহা বাড়ছে, পাঁচ কোটি ‘স্লপ’ গান সরাল স্পটিফাই
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি গানের ঢেউয়ের মুখে শ্রোতা, সংগীতশিল্পী আর স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম — সব পক্ষই এখন সীমারেখা টানতে শুরু করেছে। মঙ্গলবার স্পটিফাই জানিয়েছে, গত এক বছরে তারা সুপারিশ তালিকা থেকে প্রায় পাঁচ কোটি গান সরিয়ে দিয়েছে, যেগুলোকে প্রতিষ্ঠানটি এআই ‘স্লপ’ বা নিম্নমানের স্প্যামধর্মী কনটেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
স্পটিফাইয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাদের সম্পাদকেরা স্লপ বা স্প্যাম হিসেবে চিহ্নিত কোনো কনটেন্ট প্রোগ্রাম করেন না। প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃত মানুষ নন এমন শিল্পী প্রোফাইলে ‘এআই পারসোনা’ ব্যাজ বাধ্যতামূলক করেছে, তবে এআই দিয়ে তৈরি প্রতিটি গানে আলাদা করে লেবেল দেওয়া বাধ্যতামূলক করেনি। অন্য কয়েকটি স্ট্রিমিং সেবা এর চেয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
তবে স্লপ গানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও স্পটিফাই মোটেই এআই-বিমুখ নয়। প্রতিষ্ঠানটি ব্যবহারকারীদের জেনারেটিভ এআই দিয়ে প্লেলিস্ট তৈরির সুযোগ দেয় এবং এআই দিয়ে রিমিক্স ও কভার গান তৈরির একটি টুল আনার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। এই দ্বৈত অবস্থানই দেখিয়ে দেয়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই সংগীতকে এড়াতেও পারছে না, আবার অনিয়ন্ত্রিতভাবে গ্রহণও করতে পারছে না।
এআই সংগীতের প্রথম দিকের সমর্থকদের মধ্যেও এখন সতর্কতা দেখা যাচ্ছে। গায়িকা ও প্রযোজক গ্রাইমস তিন বছর আগে নিজের কণ্ঠের ওপর এআই উৎসাহীদের বিনামূল্যে লাইসেন্স দিয়েছিলেন। কিন্তু ছয় বছর পর আসা তার নতুন অ্যালবাম ‘সাই অপেরা’ সম্পর্কে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, কাজটি এআই দিয়ে তৈরি নয়। একটি সাময়িকী অ্যালবামটিকে ‘এআই-অনুপ্রাণিত, কিন্তু এআই-তৈরি নয়’ বলে বর্ণনা করেছে, আর গ্রাইমস নিজে তার ৭০ জনের দলকে কৃতিত্ব দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
র্যাপার এ স্যাপ রকিও একই ধরনের অবস্থান নিয়েছেন — এআই-তৈরি গান তিনি মেনে নিতে রাজি, কিন্তু নিজে তা তৈরি করবেন না। বিলবোর্ডকে তিনি বলেন, তিনি নিজে হাতে-কলমে কাজ করতেই পছন্দ করেন; কেউ শুধু প্রম্পট দিয়ে পুরোপুরি এআই-তৈরি গান বানালে সেটা তার নিজের ব্যাপার, কিন্তু তিনি নিজের সংগীত ‘সঠিক উপায়েই’ করছেন।
গায়িকা কেলি ক্লার্কসনও এআই নিয়ে উৎসাহ প্রকাশের পাশাপাশি নিজের সীমারেখা স্পষ্ট করেছেন। অর্থাৎ বড় তারকাদের অবস্থান এখন সূক্ষ্ম — প্রযুক্তিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান নয়, আবার নিজের সৃষ্টিকে যন্ত্রের হাতে ছেড়ে দেওয়াও নয়।
শ্রোতাদের অবস্থান অবশ্য তারকাদের তুলনায় অনেক কঠোর। লাখ লাখ স্ট্রিমের মাধ্যমে তারা কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে রায় দিচ্ছেন বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। বিলবোর্ডের তালিকায় এখন আধিপত্য করছে অ্যানালগ যন্ত্রনির্ভর, সহজ আয়োজনের গান ও অ্যালবাম।
সর্বশেষ সপ্তাহের বিলবোর্ড টপ ২০০ অ্যালবাম তালিকার শীর্ষ দশের বেশির ভাগ অ্যালবামেই অ্যানালগ যন্ত্রের ওপর গায়কের কণ্ঠ প্রাধান্য পেয়েছে। তালিকায় রয়েছেন অলিভিয়া রদ্রিগো, এলা ল্যাংলি, অলিভিয়া ডিন, টেলর সুইফট, নোয়া কাহান ও মরগান ওয়ালেন। হট ১০০ একক তালিকার শীর্ষ চার গানেও একই ধাঁচ — টেলর সুইফট, এলা ল্যাংলি, স্টেলা লেফটি ও মরগান ওয়ালেনের গান।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত এসেছে পুরোনো সংগীতের ফিরে আসা থেকে। বিটলসের ১৯৬৫ সালের অ্যালবাম ‘রাবার সোল’ গত সপ্তাহের বিলবোর্ড তালিকায় চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে। অনেক শ্রোতা যেন এমন এক সময়ে ফিরতে চাইছেন, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সংগীত তৈরির কোনো সুযোগই ছিল না।
এআই-তৈরি গানের অভিজ্ঞতা নিয়েও সমালোচনা কম নয়। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি এআই-তৈরি গান শোনার অভিজ্ঞতাকে নিম্নমানের খাবারের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে — মুহূর্তের উত্তেজনা থাকলেও তা মনে দাগ কাটে না, কিছুক্ষণ পরই আবার শূন্যতা ফিরে আসে। এই মূল্যায়নে ‘স্লপ’ শব্দটিকেই এআই-তৈরি কনটেন্টের সবচেয়ে উপযুক্ত বর্ণনা বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ছবিটি স্পষ্ট হচ্ছে — স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো নিম্নমানের এআই গান ছেঁটে ফেলছে, বড় শিল্পীরা নিজেদের কাজে যন্ত্রের ভূমিকা সীমিত রাখছেন, আর শ্রোতারা ভোট দিচ্ছেন মানুষের তৈরি, যন্ত্রে বাজানো বাস্তব সংগীতের পক্ষে। এআই সংগীত থাকবে কি থাকবে না, প্রশ্ন এখন সেটি নয়; প্রশ্ন হলো, তা কতটা জায়গা পাবে — সেই লড়াই এখন চার্ট, প্ল্যাটফর্ম আর শিল্পীদের স্টুডিওতে একসঙ্গে চলছে।




