বৃষ্টির অভাবে পীরগঞ্জে ফেটে চৌচির আমনের খেত, সেচের খরচে দিশেহারা কৃষক
রংপুরের পীরগঞ্জে প্রচণ্ড গরম আর দীর্ঘদিনের বৃষ্টিহীনতায় আমন ধানের খেত নিয়ে মহাবিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকায় ধানের জমিতে দেখা দিয়েছে তীব্র পানিসংকট; কোথাও কোথাও জমির মাটি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে।
বুধবার রায়পুর, বড় দরগা ও পৌর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আমন মৌসুমে কৃষকেরা সাধারণত নিয়মিত বৃষ্টির ওপরই অনেকটা নির্ভর করেন। কিন্তু এবার প্রত্যাশিত বৃষ্টি না হওয়ায় জমির আর্দ্রতা দ্রুত কমে গেছে। তীব্র রোদ ও গরমে মাটি শুকিয়ে যাওয়ায় ধানগাছ সতেজ রাখা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ অবস্থায় অনেক কৃষক সেচ দিয়ে জমিতে পানি দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাড়তি সেচ মানেই বাড়তি উৎপাদন খরচ—আর সেই চাপে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। সময়মতো বৃষ্টি না নামলে এবার ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পীরগঞ্জ উপজেলায় মোট চাষাবাদযোগ্য জমি ৩২ হাজার ৮০০ হেক্টর। চলতি মৌসুমে এর মধ্যে ২৫ হাজার ৫৯৫ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ করেছেন কৃষকেরা—অর্থাৎ উপজেলার আবাদের সিংহভাগই এখন পানির অভাবে ঝুঁকিতে।
বড় দরগা ইউনিয়নের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘ধানের জমিতে পানি নেই। বাধ্য হয়ে সেচ দিতে হচ্ছে। এতে খরচ অনেক বেড়ে গেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বৃষ্টি না হলে ফলন নিয়ে বিপদে পড়ব। এ সময় জমিতে পানি না হলে ব্যাপক ক্ষতি হবে ধানের।’
রায়পুরের কৃষক মজনু মিয়ার জমির ছবিটা আরও করুণ। তিনি বলেন, ‘জমির মাটি ফেটে গেছে। ধানগাছের বৃদ্ধি আগের মতো নেই। এখন আল্লাহর রহমতে বৃষ্টি ছাড়া উপায় দেখছি না। আমন ধান আমাদের সারা বছরের খাদ্য ও আয়ের অন্যতম ভরসা। তাই দ্রুত বৃষ্টি দরকার।’
আলমপুরের কৃষক মাহামুদুল হাসান জানান, এ সময় আমন ধানের জমিতে প্রচুর পানির প্রয়োজন। ধানগাছে শিষ বের হওয়ার পর্যায়ে পানি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় জমি শুকিয়ে আছে, ফলে বাধ্য হয়ে সেচ দিতে হচ্ছে এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
কাবিলপুরের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে সাধারণত বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করেই আমরা আমন ধানের চাষ করি। কিন্তু সময়মতো বৃষ্টি না হলে জমিতে পানির সংকট দেখা দেয়। তখন বিকল্প উপায়ে সেচের ব্যবস্থা করতে হয়। এতে বাড়তি টাকা খরচ হয়, পাশাপাশি সময় ও শ্রমও বেশি লাগে। তাই স্বল্প খরচে সেচের পানির ব্যবস্থা করা গেলে অনেক উপকার হতো।’
পৌরসভা এলাকার কৃষক রানু মিয়াও একই উদ্বেগের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, এখন ধানগাছে শিষ বের হওয়ার সময় জমিতে পানি অত্যন্ত প্রয়োজন। কৃষকেরা অনেক আশা নিয়ে ধান চাষ করেন, কিন্তু আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে সেই আশা পূরণ নিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়।
জানতে চাইলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমন আহমেদ বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিতে হবে এবং জমির আর্দ্রতা ধরে রাখতে হবে। আমরা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি। আশা করছি, আগামী দিনে বৃষ্টিপাত হলে ধানের ক্ষতি অনেকটাই কমে আসবে।’
কৃষকেরা বলছেন, আমনের এই পর্যায়ে পানিসংকট দীর্ঘ হলে শুধু ফলনই কমবে না, ধানের গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে এখন সবার চোখ আকাশের দিকে—এক পশলা ভালো বৃষ্টিই পারে পীরগঞ্জের হাজার হাজার কৃষক পরিবারের দুশ্চিন্তা অনেকটা লাঘব করতে।






