আমতলীতে জেলেদের ছয় টন চাল আত্মসাতের অভিযোগ, খালি হাতে ফিরলেন শতাধিক জেলে
বরগুনার আমতলী উপজেলার আড়পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নে জেলেদের মধ্যে সহায়তার চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিবন্ধনধারী জেলেদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন ও ইউপি সদস্যরা বিতরণ না করে ছয় টন চাল আত্মসাৎ করেছেন। তালিকায় নাম না থাকার অজুহাত দেখিয়ে শতাধিক নিবন্ধিত কার্ডধারী জেলেকে চাল না দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার জেলেরা এমন অভিযোগ করেন এবং দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
ইলিশ সম্পদ রক্ষায় সরকার ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ শিকার, আহরণ ও পরিবহন নিষিদ্ধ করেছে। এই নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের কষ্ট লাঘবে সরকার মানবিক সহায়তা হিসেবে ভিজিএফের চাল বরাদ্দ করেছে। প্রত্যেক জেলের জন্য বরাদ্দ করা হয় ২৫ কেজি করে চাল। আমতলী উপজেলায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন সাত হাজার, আর সেই সাত হাজার জেলের জন্যই সরকার চাল বরাদ্দ করেছে।
অভিযোগ রয়েছে, আড়পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়নের ১ হাজার ৬০০ জেলের জন্য ৪০ টন চাল বরাদ্দ করা হয়েছিল। জেলেদের অভিযোগ, ওই চাল ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন ও ইউপি সদস্যরা সব জেলের মাঝে বিতরণ না করে আত্মসাৎ করেছেন। শতাধিক নিবন্ধিত জেলে কার্ড নিয়ে চাল নিতে এসে খালি হাতে ফিরে গেছেন বলে অভিযোগ করেছেন জালাল, খলিল ও জামাল গাজী নামের জেলেরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আড়পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন উপজেলা খাদ্যগুদাম থেকে বরাদ্দের ৪০ টন চাল ছাড় না করে ৩৪ টন চাল ছাড় করে নিয়েছেন। জেলেদের অভিযোগ, বাকি ছয় টন চাল জেলেদের না দিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে। গত সোমবার ওই ইউনিয়নে জেলেদের মধ্যে চাল বিতরণ শেষ হয়েছে। বিতরণের তালিকায় থাকা স্বাক্ষর ও টিপসই যাচাই করলেই চাল আত্মসাতের রহস্য বেরিয়ে আসবে বলে জানিয়েছেন জেলেরা।
জেলে জালাল বলেন, জেলে কার্ড থাকা সত্ত্বেও তাঁকে চাল দেওয়া হয়নি। তালিকায় নাম না থাকার অজুহাত দেখিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, শতাধিক জেলে কার্ড নিয়ে এসে ফিরে গেছেন, কারণ তাঁদের নাকি জেলে তালিকায় নাম নেই।
অপর জেলে খলিল বলেন, ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ৩৫ জন নিবন্ধিত জেলেকে ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন ও ইউপি সদস্য খবির হোসেন চাল দেননি। তাঁদের বলে দেওয়া হয়েছে, নিবন্ধন থাকলেও তালিকায় নাম নেই। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
নাশির মাল নামের একজন অভিযোগ করেন, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তত ৩০ জন নিবন্ধিত জেলেকে চাল দেওয়া হয়নি, তালিকায় নাকি তাঁদের নাম নেই। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সব নিবন্ধিত জেলের নামে চাল বরাদ্দ হলে এই ৩০ জন জেলের চাল গেল কোথায়?
অন্যদিকে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. বশির হাওলাদার বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডে ২৭০ জন জেলে তালিকার সকলকে চাল দেওয়া হয়েছে। কোনো জেলেকে খালি হাতে ফিরতে দেওয়া হয়নি।’
আমতলী খাদ্যগুদামের চাল বিতরণ কাজে নিয়োজিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, আড়পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসনিক কর্মকর্তা ৩৪ টন চাল ছাড় করে নিয়েছেন। বাকি চাল তিনি নেননি, গুদামে রেখে গেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে আড়পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়ন পরিষদ প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। সব জেলের মাঝে চাল বিতরণ করেছি। আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।’
আমতলী উপজেলা কৃষি অফিসার ও আড়পাঙ্গাশিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রাসেল বলেন, ‘সব জেলের মধ্যেই চাল বিতরণ করা হয়েছে। চাল পায়নি এমন কারও অভিযোগ পাইনি।’
পক্ষে-বিপক্ষে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের মধ্যে জেলেদের দাবি একটাই—বিতরণ তালিকার স্বাক্ষর ও টিপসই ধরে যাচাই করে তদন্ত করা হোক। সেই যাচাই শেষ হলেই স্পষ্ট হবে বরাদ্দের চাল প্রকৃতপক্ষে কাদের হাতে পৌঁছেছে, আর ছয় টন চালের হিসাব আসলে কোথায় গড়মিল হয়েছে।






