পূজার ছুটিতে মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় প্রাণের মেলা, শিশুদের উচ্ছ্বাসে মুখর প্রাঙ্গণ
শরতের নীল আকাশ, মেঘের ভেলা আর উৎসবের আমেজ মিলিয়ে ছুটির দিনে রাজধানীর জাতীয় চিড়িয়াখানায় যেন প্রাণের মেলা বসেছে। কেউ এসেছেন সন্তানদের নিয়ে, কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে, আবার কেউ বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন প্রাণীজগতের বিচিত্র সব বাসিন্দার সামনে।
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে ছুটির আমেজে বুধবার (২১ অক্টোবর) মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের আনাগোনা ছিল চোখে পড়ার মতো। খাঁচার ভেতর বন্য প্রাণীদের চলাফেরা, পাখির ডানা ঝাপটানো আর শিশুদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো প্রাঙ্গণ।
শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ ঘুরে ঘুরে দেখছেন বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। কেউ প্রাণীদের দেখে আনন্দে মেতে উঠছেন, কেউ আবার মুঠোফোনে ছবি তুলে স্মৃতির পাতায় ধরে রাখছেন ছুটির দিনের বিশেষ মুহূর্ত।
চিড়িয়াখানার প্রবেশপথ পেরিয়ে একটু এগোতেই হাতের বাঁ পাশে চোখে পড়ে চিত্রা হরিণ। পরিচিত এই বন্য প্রাণীকে ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়েন অনেক দর্শনার্থী। ছোট্ট রাইসাকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় এসেছেন বেসরকারি চাকরিজীবী মুখলেছুর রহমান; মেয়েকে বিভিন্ন প্রাণীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে দিতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি।
মুখলেছুর রহমান বলেন, ছুটির দিনে মেয়েকে নিয়ে একটু ঘুরতে বের হয়েছেন। চিড়িয়াখানায় এলে শিশুরা বইয়ে পড়া বিভিন্ন প্রাণী সরাসরি দেখতে পারে এবং তাদের সম্পর্কে জানতে পারে। রাইসাকে নিয়ে বিভিন্ন প্রাণী দেখছেন, তারও খুব ভালো লাগছে; পরিবারের সঙ্গে এমন সময় কাটাতে পারাটা আনন্দের।
আরো কিছুটা সামনে এগোতেই দেখা মেলে রেসাস বানরের বিশাল খাঁচা। বানরগুলোর ছোটাছুটি ও নানা ভঙ্গি দেখে শিশুদের মধ্যে তৈরি হয় বাড়তি কৌতূহল। কেউ খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখছে তাদের কর্মকাণ্ড, কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের ডেকে দেখাচ্ছে পছন্দের প্রাণীটি।
এর পাশেই পেলিক্যান পাখির খাঁচা। লম্বা ঠোঁট আর বড় দেহের এই পাখি দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এক খাঁচা থেকে অন্য খাঁচায় যেতে যেতে পরিবারগুলো যেন পরিচিত হচ্ছে প্রাণিজগতের নতুন নতুন বাসিন্দার সঙ্গে।
চিড়িয়াখানার পথ ধরে সামনে এগোতেই দেখা যায় বড় বড় কাঁটায় ঢাকা সজারু। মিষ্টিকুমড়া, ছোলা-বুট ও কলা খেতে ব্যস্ত প্রাণীগুলোকে ঘিরেও দর্শনার্থীদের কৌতূহল কম নয়। শিশুরা কখনো বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকছে, কখনো অভিভাবকদের কাছে জানতে চাইছে প্রাণীগুলোর নাম ও বৈশিষ্ট্য।
এরপরই সামনে পড়ে বনের রাজা হিসেবে পরিচিত রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বিশাল দেহ আর গায়ের ডোরাকাটা দাগ নিয়ে বাঘের উপস্থিতি দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের। বাঘের খাঁচার উল্টো পাশে রয়েছে আফ্রিকান সাদা সিংহ; বিশ্রামরত সিংহটিকে দেখতে খাঁচার সামনে ভিড় করেন অনেকে।
পাশের খাঁচায় এশীয় কালো ভালুক দেখতে এসেছে রাজধানীর বাড্ডা থেকে আসা ছোট্ট সায়মন। বাবার সঙ্গে খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে ভালুকের চলাফেরা দেখছে সে। বাঘ, সিংহ ও ভালুকের মতো বড় প্রাণীদের কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা তার কাছে যেন রোমাঞ্চকর এক অভিযানের মতো।
বড় প্রাণীদের খাঁচা পেরিয়ে সামনের পথে দেখা মেলে অস্ট্রেলিয়া ও তাসমানিয়া অঞ্চলের পরিচিত পাখি ইমুর। লম্বা পায়ে ধীরগতিতে হেঁটে বেড়ানো পাখিগুলোকে দেখে অনেকেই থমকে দাঁড়ান। ফারজানা আক্তার এসেছেন তার ভাগনি রোজাকে নিয়ে; তিনি বলেন, ভাগনি বিভিন্ন ধরনের প্রাণী ও পাখি দেখছে, বিশেষ করে ইমুর মতো বড় পাখি কাছ থেকে দেখতে পেরে সে খুব আনন্দিত।
ফারজানা আক্তারের ভাষায়, শিশুদের জন্য এমন জায়গায় ঘুরতে আসা আনন্দের পাশাপাশি শিক্ষণীয়ও। প্রাণীদের সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়, আবার পরিবারের সঙ্গেও সুন্দর সময় কাটানো যায়। হাঁটতে হাঁটতে সামনে এগোতেই চোখে পড়ে বিশালদেহী জিরাফ; লম্বা গলা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাণীটিকে দেখতেও দর্শনার্থীদের আলাদা আগ্রহ দেখা যায়।
সব মিলিয়ে পূজার ছুটির এই দিনে জাতীয় চিড়িয়াখানা হয়ে উঠেছে পরিবারগুলোর মিলনমেলা। শিশুদের কাছে বইয়ের পাতার প্রাণীগুলোকে চোখের সামনে দেখার অভিজ্ঞতা, আর বড়দের কাছে পরিবারের সঙ্গে কাটানো নির্ভেজাল সময়—দুটোই মিলেছে এই এক ভ্রমণে।



