…English
বড়লেখা টুডে লোগো
সব বড় ঘটনার খবর — নিজের ভাষায়, প্রতি ঘণ্টায়
প্রচ্ছদ › লাইফস্টাইল › খবর
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — আবদুল কুদ্দুস, চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ
লাইফস্টাইল

শিশুর রাগ আর জেদ সামলাবেন কীভাবে: আগে নিজে শান্ত হোন, তারপর শেখান আবেগ নিয়ন্ত্রণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

শপিং মলের ঠিক মাঝখানে হঠাৎ ছোট্ট শিশুটি মেঝেতে শুয়ে হাত-পা ছুড়ে বিকট চিৎকার শুরু করল। আশপাশের সবাই হাঁ করে তাকিয়ে আছে। হয়তো পুরো ঘটনার পেছনে আছে মাত্র একটা আইসক্রিমের আবদার, অথচ শিশুটির কাছে মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ ঘটনাটা এইমাত্র তার সঙ্গেই ঘটে গেছে। এমন দৃশ্য অনেক পরিবারের কাছেই অপরিচিত নয়।

এমন পরিস্থিতিতে মা-বাবারও অস্বস্তি হয়। বিশেষ করে অন্য মানুষের সামনে এমন হলে বিব্রত লাগতে পারে। মনে প্রশ্ন জাগে, সন্তানকে কি ঠিকভাবে বড় করা হচ্ছে? কখনো রাগ হয়, কখনো ক্লান্ত লাগে, অনেক সময় মনে হয় — আর পারছি না। তখন অনেক মা-বাবা বই পড়েন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরামর্শ খোঁজেন, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলেন, কেউ কেউ চিকিৎসকের সাহায্যও নেন। সবার মনে একই প্রশ্ন — বাচ্চার এই আচরণ বন্ধ করব কীভাবে?

সাধারণ পরামর্শ হলো, এমন পরিস্থিতিতে নিজে শান্ত থাকতে হবে। শিশুর সঙ্গে কোমলভাবে কথা বলতে হবে, তবে নিয়মের ব্যাপারে দৃঢ় থাকতে হবে। শিশুটি কেন রেগে যাচ্ছে, সেটাও বোঝার চেষ্টা করতে হবে — হয়তো তার ক্ষুধা পেয়েছে, ঘুম পাচ্ছে, কিংবা তার মনে হয়েছে তার সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। কথাগুলো শুনতে সহজ, কিন্তু বাস্তবে মেনে চলা কঠিন। তারপরও অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে এসব পরামর্শ কাজে দেয়।

তবে সব পরিবারের ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করে না। দিনের পর দিন শিশুর রাগ, কান্না আর চিৎকার চলতে থাকলে ধৈর্যশীল মা-বাবারও ক্লান্ত হয়ে পড়া স্বাভাবিক। একসময় তাঁরা নিজেদের নিয়েই সন্দেহ করতে শুরু করেন, সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্বও তৈরি হতে পারে। তাই প্রশ্নটা শুধু ‘রাগ বন্ধ করব কীভাবে?’ নয়; আরও দুটি প্রশ্ন জরুরি — অভিভাবকেরা কীভাবে শিশুর আবেগ নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারেন, এবং কখন বুঝতে হবে তার রাগের পেছনে অন্য কোনো সমস্যা থাকতে পারে?

মনোবিজ্ঞানী জেমস গ্রসের মতে, আবেগ নিয়ন্ত্রণ বলতে বোঝায় আমরা কোন আবেগ অনুভব করব, কখন করব এবং সেই আবেগ কীভাবে অনুভব ও প্রকাশ করব — তা সামলানোর প্রক্রিয়া। শিশুরা জন্মের সময় এই দক্ষতা নিয়ে আসে না। মস্তিষ্কের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তারা ধীরে ধীরে তা অর্জন করে, আর এতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন মা-বাবা ও যত্ন নেওয়া অন্য মানুষেরা।

প্রতিদিনের ছোট ছোট ঘটনা থেকেই শিশুরা শেখে। ভয় পেলে কেউ তাকে সান্ত্বনা দেয়, রেগে গেলে কেউ তার কথা শোনে, মন খারাপ হলে কেউ পাশে বসে থাকে — এ রকম হাজারো অভিজ্ঞতা শিশুকে ধীরে ধীরে নিজের আবেগ বুঝতে ও সামলাতে সাহায্য করে। আবেগ সামলানোর সঙ্গে মস্তিষ্কের আরেকটি দক্ষতার সম্পর্ক আছে, যাকে বলে এক্সিকিউটিভ ফাংশন — অনেকটা মস্তিষ্কের ট্রাফিক পুলিশের মতো, যার সাহায্যে আমরা মনোযোগ ধরে রাখতে পারি, চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি এবং কোনো কাজ করার আগে একটু থামতে পারি।

শিশুর মস্তিষ্কের আবেগ সামলানোর ব্যবস্থা ছোটবেলায় পুরোপুরি তৈরি থাকে না। তাই এ সময় মা-বাবা বা যত্ন নেওয়া বড়রা একধরনের বাইরের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করেন। শিশু যখন নিজেকে শান্ত করতে পারে না, তখন বড়দের শান্ত আচরণ তাকে সাহায্য করে। নিরাপদ ও নিয়মিত যত্ন মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারে — মস্তিষ্কের এই অংশ চিন্তা করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও আচরণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় কো-রেগুলেশন বা একসঙ্গে আবেগ সামলানো। প্রথমে বড়রা শিশুকে আবেগ সামলাতে সাহায্য করেন, পরে সেই দক্ষতা ধীরে ধীরে শিশুর নিজের মধ্যে তৈরি হয় — তখন সে নিজেই নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে, যাকে বলে সেলফ-রেগুলেশন বা আত্মনিয়ন্ত্রণ। গবেষণায়ও এর প্রমাণ মিলেছে। একটি ছোট গবেষণায় দেখা গেছে, নবজাতকদের মায়ের বুকের সঙ্গে ত্বক লাগিয়ে রাখলে (স্কিন টু স্কিন) তাদের ব্যথার অনুভূতি কমে। আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, অপরিচিত কারও ছবির বদলে নিজের মায়ের ছবি দেখলে শিশুদের মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা — ভয় ও বিপদের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত অংশ — এর প্রতিক্রিয়া কমে যায় এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাতেও উন্নতি দেখা যায়। তবে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে একই প্রভাব পাওয়া যায়নি।

তাহলে রাগের মুহূর্তে ঠিক কী করবেন? প্রথমত, প্রথমে নিজেকে শান্ত করুন। শিশু চিৎকার করছে বলে আপনাকেও চিৎকার করতে হবে না। ধীরে শ্বাস ছাড়ুন, গলার স্বর নিচু রাখুন, সম্ভব হলে শিশুর চোখের সমান উচ্চতায় বসুন। আপনার শান্ত আচরণ তাকে নিরাপদ বোধ করতে সাহায্য করবে। দ্বিতীয়ত, কম কথা বলুন। খুব রেগে গেলে শিশুর মস্তিষ্ক যুক্তি বুঝতে পারে না, তাই সেই মুহূর্তে লম্বা বক্তৃতা নয়; সংক্ষেপে বলতে পারেন, ‘তোমার বানানো টাওয়ারটা ভেঙে গেছে বলে খুব রাগ হচ্ছে, তাই না?’ তবে কোনো শিশু অনুভূতির কথা শুনলে আরও উত্তেজিত হয়ে যেতে পারে — তার ক্ষেত্রে জোর করবেন না, নিজে শান্ত থাকুন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরে কথা বলুন।

তৃতীয়ত, নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকুন, কিন্তু শিশুকে নিরাপদ রাখুন। শান্ত থাকা মানে শিশুর প্রতিটি দাবি মেনে নেওয়া নয়। কোনো কাজে নিষেধ করলে সেই নিয়মে স্থির থাকুন, তবে রাগ করে অপমান করা বা ভয় দেখানোর দরকার নেই — কোমল থেকেও দৃঢ় থাকা যায়, ভালোবেসেও ‘না’ বলা যায়। চতুর্থত, সময় দিন। অনেক শিশুর রাগ কমতে কিছুটা সময় লাগে; এ সময় তার কাছাকাছি থাকুন। সে স্পর্শ পছন্দ না করলে জোর করে জড়িয়ে ধরবেন না — অনেক সময় শুধু পাশে কেউ থাকাই সবচেয়ে বড় সাপোর্ট। পঞ্চমত, রাগ কমলে আবার কাছে টানুন। আদর করুন, প্রয়োজনে কিছু খেতে দিন, বলুন, ‘আজকের ঘটনাটা বেশ কঠিন ছিল, তাই না?’ এতে শিশু বুঝবে, রাগ বা কান্না হলেও সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়নি।

মনে রাখতে হবে, রাগের মুহূর্ত শিশুকে আবেগ সামলানো শেখানোর ভালো সময় নয়। সে যখন শান্ত থাকে, তখনই শেখানো সম্ভব সবচেয়ে বেশি। গল্পের বই পড়ার সময় চরিত্রগুলোর অনুভূতি নিয়ে কথা বলুন — গল্পের কোনো চরিত্র খেলায় হেরে গেলে তার কেমন লাগতে পারে, সে রাগ করলে কী করতে পারে? একসঙ্গে শান্ত হওয়ার কৌশলও অনুশীলন করা যায় — কল্পনা করুন সামনে জন্মদিনের মোমবাতি জ্বলছে, এবার ধীরে ফুঁ দিয়ে সেটি নেভানোর চেষ্টা করুন; এভাবে ধীরে শ্বাস ছাড়ার অনুশীলন হয়। ‘রেড লাইট, গ্রিন লাইট’, ‘সাইমন সেজ’ কিংবা গান থামলে স্থির হয়ে যাওয়ার মতো খেলাও আত্মনিয়ন্ত্রণের দক্ষতা বাড়ায়, কারণ এসব খেলায় শিশুকে নির্দেশ শুনতে হয়, অপেক্ষা করতে হয় এবং প্রয়োজনে নিজের কাজ থামাতে হয়।

দৈনন্দিন অভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর ঘুম যেন ঠিকমতো হয়, খাওয়ার সময় যেন খুব বেশি দেরি না হয় — সেদিকে খেয়াল রাখুন। এক কাজ থেকে অন্য কাজে যাওয়ার আগে জানিয়ে দিন, ‘আর পাঁচ মিনিট খেলবে, তারপর গোসল করতে হবে।’ এতে হঠাৎ পরিবর্তনের ধাক্কা কমে। আর শিশু যখন নিজের রাগ সামলাতে পারে, একটু অপেক্ষা করে কিংবা মারামারি না করে কথা দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করে, তখন তার প্রশংসা করুন — বলুন, ‘তুমি রেগে গিয়েও এবার হাত দিয়ে মারোনি, কথায় বুঝিয়েছ। এটা ভালো করেছ।’ নিজের অগ্রগতিও লক্ষ করুন — আগে যে পরিস্থিতিতে খুব রেগে যেতেন, এখন সেখানে একটু শান্ত থাকতে পারছেন কি না।

তবে শিশুকে শান্ত রাখতে হলে বড়দের নিজেদেরও শান্ত থাকতে হয়, আর সেটা বলা যত সহজ, করা তত সহজ নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রিয় কাউকে কষ্ট পেতে দেখলে মস্তিষ্কের অ্যান্টেরিয়র ইনসুলা ও অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্সের মতো অংশগুলো সক্রিয় হয় — যেগুলো নিজের ব্যথা অনুভব করার সময়ও সক্রিয় হয়। তাই শিশুর কান্না শুনে বড়দের অস্থির লাগা স্বাভাবিক, আর নিজের এই প্রতিক্রিয়া বুঝতে না পারলে মা-বাবাও পরিস্থিতিতে জড়িয়ে রেগে যেতে পারেন।

সবশেষে, শিশু যত দিন নিজে আবেগ সামলানোর দক্ষতা অর্জন না করবে, তত দিন তার রাগ বা কান্না পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার আশা করা ঠিক নয়। ধৈর্য, ধারাবাহিকতা আর শান্ত উপস্থিতিই দীর্ঘমেয়াদে কাজ করে। তবে রাগ যদি দিনের পর দিন মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, দীর্ঘস্থায়ী হয় কিংবা শিশুর স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত করে, তাহলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়াই হবে সঠিক সিদ্ধান্ত।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন — জাকির হোসেন, সম্ভাব্য ইউপি সদস্য পদপ্রার্থী, ৭ নং ওয়ার্ড, ৫ নং দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়ন

লাইফস্টাইল বিভাগের আরও খবর

লাইফস্টাইল

ক্রাচে ভর করে ১৮ বছর: ইট ভেঙে সংসার চালান চাঁদপুরের বিল্লাল খান

চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলা সদরের কলাদী এলাকায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের নিচতলায় মেঝেতে বসে হাতুড়ি দিয়ে ইট ভাঙছিলেন বিল্লাল খান। বয়স ৪২ বছর। পাশেই …

লাইফস্টাইল

চেনা জায়গাও হঠাৎ অচেনা লাগে কেন? মস্তিষ্কের ‘জামেই ভু’ রহস্য

যে রাস্তায় প্রতিদিন যাতায়াত, যে বাড়িতে বছরের পর বছর থাকা, কিংবা যে জায়গার প্রতিটি কোণ চেনা—হঠাৎ কখনও সেই পরিচিত পরিবেশকেই অচেনা মনে হতে পারে। মনে …