হুথি হামলা ঠেকাতে সৌদি আরবে টাইফুন যুদ্ধবিমান পাঠাচ্ছে যুক্তরাজ্য, ভূমিকা হবে শুধু প্রতিরক্ষামূলক
ইয়েমেনের হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বেড়ে যাওয়ায় সৌদি আরবকে রক্ষা করতে রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) টাইফুন যুদ্ধবিমান মোতায়েন করবে যুক্তরাজ্য। যুক্তরাজ্য সরকারের বরাতে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এই খবর জানিয়েছে।
ইরানপন্থি গোষ্ঠীটির আকাশপথের হামলা থেকে সৌদি শহর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় সহায়তা করবে এই প্রতিরক্ষামূলক মিশন। প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এই পদক্ষেপের অনুমোদন দিয়েছেন। সৌদি রাজধানী রিয়াদে এবং দেশটির উপকূলের জ্বালানি স্থাপনায় হুথিদের হামলার পর এই সিদ্ধান্ত এলো।
মঙ্গলবার এক লিখিত বিবৃতিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেন, এসব বিমান প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকায় কাজ করবে এবং হুথিদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক হামলা চালাবে না। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি একটি এ৪০০এম পরিবহন বিমান ও উপদেষ্টাও পাঠানো হচ্ছে, এবং সৌদি বিমান অভিযানের জন্য আগে থেকে সম্মত আকাশে জ্বালানি সরবরাহের (এয়ার-টু-এয়ার রিফুয়েলিং) সহায়তাও বাড়ানো হচ্ছে।
পটভূমিতে রয়েছে ইয়েমেনের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ। হুথিরা ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত, আর সৌদি আরব সেই সরকারকে সমর্থন করে। ২০১৪ সালে রাজধানী সানা থেকে সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে গোষ্ঠীটি।
ইয়েমেনে একধরনের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর সেপ্টেম্বর থেকে হুথিদের হামলা ঠেকিয়ে আকাশসীমা রক্ষায় হিমশিম খাচ্ছে সৌদি আরব। হুথিরা স্বীকৃত সরকারের বিরুদ্ধে নতুন আক্রমণ শুরু করেছে এবং গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। সৌদি আকাশ সুরক্ষায় থাকা বাহিনী পাল্টা আক্রমণ চালালে জবাবে সৌদি ভূখণ্ডের গভীরে লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে হুথিরা।
কিং খালেদ বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ বন্দরসহ সৌদি অবকাঠামোতে আঘাত হেনেছে হুথিরা। গত সপ্তাহে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, দেশটির বিমানবন্দরগুলোতে হুথি হামলায় ১৯ জন নিহত হয়েছেন। ১০ অক্টোবর রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত এবং ৩০৮ জন আহত হন—এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা।
পশ্চিম ইয়েমেনে সানাসহ হুথি-নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে হামলার প্রতিশোধ হিসেবেও এই আক্রমণগুলোকে দেখা হচ্ছে। এ সপ্তাহের শুরুতে ইয়েমেনের মধ্যাঞ্চলীয় শাবওয়া প্রদেশে আতাক শহরের কাছে আল-আলাম শিবিরে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৭৩ জনের বেশি নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সশস্ত্র বাহিনীর এক মুখপাত্র জানান, শিবিরটিতে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়; হুথিদের সামরিক মুখপাত্র বলেন, তারা সৌদি শত্রুর সমাবেশ লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।
অন্যদিকে উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনে হুথি-পরিচালিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে সৌদি বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণে অন্তত ১৪১ জন নিহত এবং ৩৯৫ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ সীমান্তের দুই পাশেই প্রাণহানি বাড়ছে, যার মধ্যেই ব্রিটিশ মোতায়েনের সিদ্ধান্ত এলো।
তবে যুক্তরাজ্য-সৌদি সামরিক সম্পর্কের ইতিহাস এই সংকটের চেয়ে অনেক পুরোনো—সৌদি রাজত্ব প্রতিষ্ঠারও আগের। ১৯১৫ সালের ডিসেম্বরে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্যেষ্ঠ ব্রিটিশ কর্মকর্তা স্যার পার্সি কক্স মধ্য আরবের নেজদের শাসক আবদুল আজিজ ইবন সৌদের সঙ্গে দারিন চুক্তি করেন; অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের পক্ষ নেওয়ার বিনিময়ে ব্রিটেন তাঁকে অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সমর্থন করে। ১৯২৭ সালের মে মাসে জেদ্দায় নতুন চুক্তি হয়, আর ১৯৩২ সালে আবদুল আজিজ সৌদি আরব রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
আকাশ প্রতিরক্ষায় সহযোগিতার ধারাটিও পুরোনো। ১৯৬৬ সালে সৌদি আরব ব্রিটিশ এয়ারক্রাফট করপোরেশনের কাছ থেকে ৪০টি লাইটনিং যুদ্ধবিমান ও ২৫টি জেট প্রশিক্ষণ বিমান এবং একটি রাডার ব্যবস্থা কেনার চুক্তি করে। ১৯৮৫ সালে দুই সরকারের মধ্যে হয় তেলের বিনিময়ে অস্ত্রের বিখ্যাত আল-ইয়ামামাহ চুক্তি, যার আওতায় টর্নেডো ও হক জেট সরবরাহ করা হয়; রয়টার্স এই চুক্তিগুলোকে ব্রিটিশ ইতিহাসের বৃহত্তম রপ্তানি চুক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে, যেখানে টর্নেডোসহ সরঞ্জামের মূল্য হিসেবে প্রতিদিন ছয় লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল বরাদ্দ রেখেছিল সৌদি আরব।
১৯৯০ সালের আগস্টে ইরাক কুয়েত আক্রমণ করলে সৌদি বাদশাহ ফাহাদ বন্ধু সরকারগুলোর সাহায্য চান; ১১ আগস্ট সাইপ্রাসের আক্রোতিরি থেকে ১২টি আরএএফ টর্নেডো যুদ্ধবিমান সৌদি আরবের ধাহরানে উড়ে যায়, পরে তাবুক ও ধাহরানে আরও মোতায়েন হয়। ২০০৩ সাল পর্যন্ত সৌদি ঘাঁটি থেকে দক্ষিণ ইরাকের ওপর নো-ফ্লাই জোনে টহল দিয়েছে ব্রিটিশ বিমান।
টাইফুন যুগেও বন্ধন অব্যাহত থাকে। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে ৭২টি টাইফুন কেনার চুক্তি করে, যার মূল্য ছিল ৪ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন পাউন্ড; নির্মাতা বিএই সিস্টেমস একে ‘সালাম প্রকল্প’ নাম দেয়। ২০১৮ সালের মার্চে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের লন্ডন সফরের সময় আরও ৪৮টি টাইফুন কেনা চূড়ান্ত করতে সমঝোতা স্মারক সই হয়। টাইফুন নির্মাণে অংশীদার জার্মানি সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রিতে আপত্তি তুললেও ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সেই আপত্তি প্রত্যাহার করে নেয়।
এই সম্পর্ক সব সময় বিতর্কমুক্তও ছিল না। ২০১৯ সালের জুনে যুক্তরাজ্যের আপিল আদালত রায় দেন, ইয়েমেনে সম্ভাব্য ব্যবহারের জন্য সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রির লাইসেন্স দেওয়ার সময় অতীত ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘিত হয়েছে কি না তা যাচাই না করে সরকার বেআইনি কাজ করেছে; নতুন লাইসেন্স স্থগিত হয়। ২০২০ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী লিজ ট্রাস পার্লামেন্টে জানান, লাইসেন্স আবার চালু হবে, কারণ অস্ত্রগুলো আইনের গুরুতর লঙ্ঘনে ব্যবহৃত হওয়ার স্পষ্ট ঝুঁকি নেই।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিটেন সরাসরি হুথিদের বিরুদ্ধেও অভিযানে অংশ নিয়েছে—গাজায় বোমাবর্ষণের প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট লোহিত সাগরের জাহাজে হুথি হামলার পর ২০২৪ সালে আরএএফ টাইফুন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইয়েমেনে হামলায় যোগ দেয়। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে সৌদি যুদ্ধবিমানে আকাশে জ্বালানি সরবরাহে সহায়তার জন্য একটি ভয়েজার ট্যাংকারও পাঠায় ব্রিটেন; সেই বিমানগুলো সৌদি বিমানবাহিনীর ওড়ানো ব্রিটিশ-নির্মিত টাইফুনই।
সব মিলিয়ে এবারের টাইফুন মোতায়েন শতবর্ষের বেশি পুরোনো এক সামরিক অংশীদারত্বের সর্বশেষ অধ্যায়। লন্ডন জোর দিয়ে বলছে, ভূমিকা হবে কেবল প্রতিরক্ষামূলক; কিন্তু হামলা-পাল্টা হামলার গতি যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই মোতায়েন মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় কতটা প্রভাব ফেলবে, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।



