ফ্রান্সে রাতের কারফিউ ‘যতদিন প্রয়োজন’ চলবে: প্যারিস-লিওঁর পর মার্সেইতেও বিধিনিষেধ
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস ও লিওঁ শহরের কেন্দ্রগুলোতে মঙ্গলবার নতুন করে রাতের কারফিউ জারি করা হয়েছে। বছরের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক দাঙ্গার পর প্রথম শান্ত রাত কাটানোর পরই এই সিদ্ধান্ত এলো। কর্তৃপক্ষ বলছে, কারফিউ চলবে ‘যতদিন প্রয়োজন’।
প্যারিস পুলিশ বলেছে, নির্ধারিত দুটি এলাকায় — প্লাস দ্য লা রেপুব্লিকের আশপাশে এবং লে আল শপিং জেলায় — কারফিউ রাতারাতি ‘জনশান্তি’ ফিরিয়ে এনেছে, আর তা বহাল থাকবে ‘যতদিন প্রয়োজন’।
তবে কারফিউয়ের আওতার বাইরে রয়ে গেছে শনিবার ক্ষতিগ্রস্ত অন্য এলাকাগুলো — শঁজেলিজে, সাঁ-লাজার ট্রেন স্টেশনের আশপাশ এবং মধ্য প্যারিসের রু দ্য তুর্বিগোর কিছু অংশ, যেখানে বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড তুলে আগুন জ্বালিয়েছিলেন।
ফ্রান্সের অন্যতম বড় শহর লিওঁতেও কর্তৃপক্ষ শহরকেন্দ্রে রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ নবায়ন করেছে। তারা বলছে, রাতভর কোনো অশান্তির খবর পাওয়া যায়নি।
দেশের দ্বিতীয় বড় শহর মার্সেই মঙ্গলবার রাত থেকে অপ্রাপ্তবয়স্কদের একা বাইরে থাকার ওপর কারফিউ জারি করেছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু বলেছেন, লক্ষ্যভিত্তিক এই কারফিউগুলো ‘গত রাত শান্ত রাখতে সাহায্য করেছে’।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ শনিবার সহিংসতায় রূপ নেওয়ার পর থেকেই ফ্রান্সজুড়ে উত্তেজনা চলছে। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে জ্বালানির দাম নিয়ে ফ্রান্সকে নাড়িয়ে দেওয়া ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের গোষ্ঠীগুলো ও ছাত্র ইউনিয়নগুলো শনিবার আবার বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে।
সেই দিনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকারও। লেকর্নু জাতীয় পরিষদে বলেছেন, আগামী শনিবারের জন্য পুলিশ মোতায়েন হবে ‘ব্যাপক’ — তবে সংখ্যাটি তিনি জানাননি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লোরাঁ নুনিয়েজ আইনপ্রণেতাদের বলেছেন, ২০১৫ সালের ইসলামিক স্টেট হামলার পর থেকে ফ্রান্সের শহরগুলোতে টহল দেওয়া সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান সাঁতিনেলের সেনারা সংবেদনশীল স্থাপনাগুলোর পাহারার দায়িত্ব নেবেন, যাতে আরও বেশি পুলিশ ও জেন্ডার্মকে ভিড় নিয়ন্ত্রণে পাওয়া যায়।
এর মধ্যে মঙ্গলবার পুলিশ মধ্য ফ্রান্সের লিমোজে ঐতিহাসিক সিটি হলে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে। বিচারমন্ত্রী জেরাল দারমানাঁ বলেছেন, ওই ব্যক্তি পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন এবং তিনি একা কাজ নাও করে থাকতে পারেন।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সন্দেহভাজন ব্যক্তি উগ্র পরিবেশবাদী আন্দোলনের ঘনিষ্ঠ এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে নজরদারিতে থাকা ব্যক্তিদের তালিকায় ছিলেন। দারমানাঁ তার পরিচয় নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করলেও বলেন, উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলো ফ্রান্সজুড়ে রাষ্ট্রের প্রতীকগুলোতে হামলার জন্য সংগঠিত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
১৪৩ বছরের পুরোনো ভবনটি আগুনে জ্বলতে থাকা এবং তার ঘণ্টাঘর ধসে পড়ার ফুটেজ সপ্তাহান্তে অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তা এক্সে শেয়ার করে অশান্তির জন্য অভিবাসনকে দায়ী করেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ভিডিওটি ছড়িয়ে দিয়ে বলেন, অভিবাসীরা ‘ফ্রান্স দখল করে নিয়েছে’।
ফরাসি কর্মকর্তারা অবশ্য সহিংসতার জন্য উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠী ও সুযোগসন্ধানী লুটেরাদেরই দায়ী করেছেন। শনিবার ফ্রান্সজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্কুলগুলোর খারাপ অবস্থার প্রতিবাদে বিক্ষোভের সময় দাঙ্গাকারীরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়, গাড়িতে আগুন দেয় ও সরকারি ভবনে হামলা চালায় — এর পর অন্তত ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রোববার সন্ধ্যায় ছোট ছোট দল প্যারিস, লিওঁ, মার্সেইসহ অন্য শহরগুলোতে রাস্তায় আবর্জনার বিন, সাইকেল ও অন্যান্য জিনিসে আগুন দেয় এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালায়।
সোমবার রাতে প্যারিসে পুলিশের একটি হেলিকপ্টার সারা রাত প্লাস দ্য লা রেপুব্লিকের ওপর চক্কর দেয় — সপ্তাহান্তের সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দু এই চত্বরটি সার্চলাইট দিয়ে যাচাই করা হয় কারফিউ মানা হচ্ছে কি না।
মঙ্গলবার ভোরে কর্মীরা ক্রেন দিয়ে চত্বরের কেন্দ্রে মূর্তির গায়ে জড়ানো দৈত্যাকার ফ্লুরোসেন্ট হলুদ ভেস্টটি সরিয়ে নেন, তারপর প্রেশার ওয়াশার দিয়ে স্মৃতিস্তম্ভের গ্রাফিতি ধুয়ে ফেলেন। শান্ত একটি রাত পেরোলেও শনিবারের নতুন বিক্ষোভের সামনে ফ্রান্সের শহরগুলো আবার টানটান উত্তেজনায় রয়েছে।





