পদত্যাগেই কি শেষ সব দায়? রাড্ডা ও গেণ্ডারিয়ার ঘটনায় আইনের মুখোমুখি হবেন কারা
রাজধানীর মিরপুরে ভেকু দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে একটি বেসরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, গেণ্ডারিয়ায় প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে লোকজনকে ধাওয়া করার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। পৃথক দুই ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের দুই জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর এসেছে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠেছে, পদত্যাগের মধ্য দিয়েই কি শেষ হবে সব দায়? নাকি রাজনৈতিক পদ হারানোর পরও অভিযোগের তদন্ত, আইনি ব্যবস্থা ও বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে তাদের?
সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে এসব পদক্ষেপকে রাজনৈতিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির বার্তা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। প্রথম ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম এসেছে আলোচনায়; দ্বিতীয় ঘটনায় বিতর্কে পড়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাড্ডা ও গেণ্ডারিয়ার ঘটনার প্রকৃতি এক নয়। রাড্ডায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা হয়েছে। অন্যদিকে গেণ্ডারিয়ার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন, আত্মরক্ষার দাবি এবং লাইসেন্সের শর্ত মেনে চলা নিয়ে। দুটি ঘটনায় অভিযোগের ধরন আলাদা হলেও মূল প্রশ্ন এক — অভিযোগের তদন্ত কত দূর এগোবে এবং অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
ঘটনার শুরু গত ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে। রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বরের রাড্ডা এমসিএইচএফপি সেন্টারে হামলা চালানো হয়। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, দেশীয় অস্ত্র ও ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে দুই শতাধিক ব্যক্তি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রবেশ করে নিরাপত্তাকর্মীদের মারধর ও আটকে রাখেন। পরে ভেকু দিয়ে একটি টিনশেড ও তিনটি সেমিপাকা ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় আলট্রাসনোগ্রাম, টিকাদান ও ল্যাবরেটরি কক্ষ। লুট করা হয় ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী।
১৯৭৪ সাল থেকে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানটির দাবি, হামলায় কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। এতে দরিদ্র নারী ও শিশুদের চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হয়েছে। হামলার পর জমি দখলের চেষ্টায় স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। আলোচনায় আসে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নাম। তার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজনের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি’র সঙ্গে মিষ্টির অতীত সম্পৃক্ততার তথ্যও সামনে আসে।
তবে মিষ্টি অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, বর্তমানে ওই সমিতির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরেও তিনি জড়িত নন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত ১ অক্টোবর তিনি সংসদ সদস্যের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। পরে তার আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়।
আইনি প্রক্রিয়াও এগিয়েছে। রাড্ডা সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক নাসরিন আখতার ২৬ সেপ্টেম্বর শাহ আলী থানায় মামলা করেন। মামলায় স্থানীয় বিএনপি নেতা হানিফ মিয়ার নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়। তবে প্রাথমিক এজাহারে মিষ্টির নাম ছিল না। আইন অনুযায়ী, এজাহারে নাম না থাকলেও তদন্তে কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে। একইভাবে অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না পাওয়া গেলে কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করারও সুযোগ নেই।
এই ঘটনায় সামনে এসেছে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন। হামলার নির্দেশ কে দিয়েছিলেন, ভেকু কারা সরবরাহ করেছিলেন, হামলাকারীদের সংগঠিত করেছিলেন কারা এবং জমি দখলচেষ্টার নেপথ্যে কারা ছিলেন? কয়েক ঘণ্টা ধরে হামলা চলার অভিযোগ সত্ত্বেও পুলিশ কেন তা প্রতিরোধ করতে পারেনি, সেই প্রশ্নও রয়েছে। ঘটনার পর শাহ আলী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়, যদিও পুলিশ প্রশাসন একে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ১ অক্টোবর সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, তদন্তে মিষ্টির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও অভিযোগপত্র দেওয়া হবে। দলীয় ব্যবস্থা ও আইনি ব্যবস্থা আলাদা বলেও তিনি স্পষ্ট করেছিলেন। তবে তদন্তে মিষ্টির বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কিনা কিংবা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে সর্বশেষ নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
রাড্ডার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন বিতর্ক তৈরি হয় গেণ্ডারিয়ায়। গত ১৭ অক্টোবর গেণ্ডারিয়া রেলস্টেশনসংলগ্ন এলাকায় মাদকবিরোধী কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে কয়েকজনকে ধাওয়া করতে দেখা যায় ইশরাক হোসেনকে। ভিডিওটি তিনি নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করেন। ইশরাকের দাবি, ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যক্তি মারমুখী ভঙ্গিতে তার গাড়িবহরের দিকে এগিয়ে আসায় আত্মরক্ষার্থে তিনি ও তার নিরাপত্তারক্ষীরা লাইসেন্সকৃত অস্ত্র প্রদর্শন করেন। তার আরও দাবি, স্থানীয় পুলিশের সহযোগিতায় কয়েকটি মাদকের আস্তানা উচ্ছেদ করা হয় এবং ছয়জনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
বিতর্কের মধ্যে সোমবার প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে সংবাদ সম্মেলনে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন ইশরাক হোসেন। এ ঘটনায় ডিএমপির গোয়েন্দাপ্রধান মো. শফিকুল ইসলাম ১৮ অক্টোবর জানান, স্থানীয় উপপুলিশ কমিশনারকে ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আইনের ব্যত্যয় পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স আত্মরক্ষার জন্য দেওয়া হলেও তা জনসমক্ষে ইচ্ছামতো অস্ত্র প্রদর্শন কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব পালনের অবাধ অনুমতি নয়। আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা, ২০২৫-এর ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে অন্যের ভয় বা বিরক্তি সৃষ্টি হয়, এমনভাবে অস্ত্র প্রদর্শনের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে ভিডিও, ঘটনার পরিস্থিতি, সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা ও লাইসেন্সের শর্ত যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্ন এসেছে। সাবেক আইজিপি বাহারুল আলমও বিষয়টিতে লাইসেন্স প্রদানকারী জেলা প্রশাসনের ভূমিকার কথা বলেছেন।
অতিরিক্ত আইজিপি সায়েদুর রহমান বলেছেন, ‘আইন সবার জন্য সমান। কেউ প্রভাবশালী হোক বা অন্য কেউ, কাউকে কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। কোনো ঘটনা ঘটলে পুলিশ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।’ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নিয়ে তিনি বলেন, আত্মরক্ষার প্রয়োজন বিবেচনায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কাউকে লাইসেন্স দিতে পারেন; তবে লাইসেন্স দেওয়ার আগে পুলিশের মতামত নেওয়া হয় এবং নির্দিষ্ট কিছু শর্ত থাকে। মূলত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট লাইসেন্স দেন, পুলিশ নয়। পুলিশ পর্যাপ্ত সরঞ্জামে সজ্জিত ছিল না বলেই ইশরাক হোসেনকে অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে — এমন দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটি তাঁর দাবি। আমরা সব সময় প্রয়োজনীয় সরঞ্জামে সজ্জিত থাকি।’ প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণে তদন্তে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে স্বীকার করে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো অভিযোগ তাদের কাছে আসেনি এবং কেউ ছাড়ও চাননি।
মানবাধিকারকর্মীদের অবস্থান আরও স্পষ্ট। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায় — রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তাকে পদত্যাগ করিয়ে কিংবা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তার মতে, পদত্যাগ রাজনৈতিক ও নৈতিক জবাবদিহির অংশ হতে পারে, কিন্তু সেটিকে কোনোভাবেই ফৌজদারি অপরাধের বিচার কিংবা আইনগত দায় নির্ধারণের বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একজন সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠলে যে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়, একজন মন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্যের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
ইজাজুল ইসলাম আরও বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পদত্যাগের পর অভিযোগের তদন্ত কীভাবে এগোচ্ছে। প্রকৃত অপরাধী কারা, ঘটনার পরিকল্পনাকারী বা নির্দেশদাতা কেউ আছেন কিনা — তদন্তে এসব বেরিয়ে আসছে কিনা, তা দেখতে হবে। শুধু পদত্যাগের মধ্য দিয়ে আলোচনা থেমে গেলে এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া দৃশ্যমান না হলে জনমনে দায়মুক্তির ধারণা তৈরি হতে পারে। তবে অভিযোগ ওঠা মানেই কেউ অপরাধী নন; নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করাটাই মূল বিষয়। তদন্তকারী সংস্থাকে প্রভাবমুক্ত রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার ওপরও জোর দেন তিনি।
অন্যদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় প্রাথমিকভাবে অভিযোগ পাওয়ায় ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগ করতে হয়েছে; তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হলে নিশ্চয়ই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের পদত্যাগের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী অন্যদের সতর্ক করেছেন, যা অতীতে ছিল না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শেষ কথা হলো — পদত্যাগ রাজনৈতিক জবাবদিহির অংশ হতে পারে, কিন্তু তা অপরাধ প্রমাণ করে না; আবার সম্ভাব্য অপরাধের তদন্তও থামিয়ে দেয় না। ক্ষমতার পদ ছাড়ার পরও রাষ্ট্রের আইন একইভাবে কার্যকর হচ্ছে কিনা, সেটাই এখন দেখার বিষয়।





