প্রকাশ্যে বৈধ অস্ত্রের প্রদর্শন থামছে না, ছয় বছরে ১১ ঘটনায় শাস্তি হয়নি কারও, লাইসেন্সও বাতিল হয়নি একটিও
অস্ত্রকাণ্ডে বিতর্কের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রতিমন্ত্রীর পদ ছেড়েছেন ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন। কিন্তু এই ঘটনা একক নয়। গত ছয় বছরে সাবেক সংসদ সদস্যসহ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা অন্তত ১০ বার বৈধ অস্ত্র প্রকাশ্যে বেআইনিভাবে প্রদর্শন করেছেন; কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, এমন ঘটনায় লাইসেন্স বাতিলযোগ্য হলেও তা-ও করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে বৈধ অস্ত্রের বেআইনি প্রদর্শনে শাস্তি না হওয়া এবং লাইসেন্স বাতিল না করাই এমন ঘটনা থামাতে না পারার বড় কারণ। বেশির ভাগ ঘটনায় তদন্ত শেষে পুলিশ কোনো ব্যত্যয় খুঁজে পায়নি বলেই আলোচনা-সমালোচনা থেমে গেছে।
সর্বশেষ প্রদর্শনটি ইশরাক হোসেনের। গত শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেন তিনি। সমালোচনার মুখে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সোমবার তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তাঁর দাবি, আত্মরক্ষার জন্য তিনি লাইসেন্স করা অস্ত্র বের করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সোমবার সংবাদ সম্মেলনে জানান তিনি।
পুলিশ বলেছে, মাদকবিরোধী অভিযানে ইশরাক ও তাঁর সঙ্গীদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকার ঘটনার তদন্ত চলছে। রোববার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম বলেন, ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনারকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে; আইনের ব্যত্যয়ের তথ্য-প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা ২০২৫ অনুযায়ী, বৈধ অস্ত্র আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহার করা যাবে। তবে অন্যের ভয় বা বিরক্তির কারণ হয়, এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না। এই শর্ত ভঙ্গ করলে অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলযোগ্য হবে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সৈয়দপুরে আহত এক দলীয় কর্মীকে দেখতে গিয়ে শটগান হাতে ছবি তোলেন বিএনপির স্থানীয় নেতা আবু তাহের। ২ মার্চ ছবিটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়ালে সমালোচনা হয়। তাহের নিজের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র রাখার কথা জানান। ৩ মার্চ সীতাকুণ্ড মডেল থানা জানায়, অস্ত্রটি লাইসেন্স করা; তাহেরের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ওসি মহিনুল ইসলাম বলেন, অস্ত্রটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থানায় জমা ছিল, ঘটনার দিনই তিনি তা বুঝে নেন; কাউকে ভয় দেখানোর জন্য ব্যবহার করেননি, আইনের বড় কোনো ব্যত্যয় হয়নি।
এরপর ১৭ আগস্ট পাবনার ঈশ্বরদীতে ছাত্রদলের সাবেক নেতা জুবায়ের হোসেন বাপ্পী মাথায় কাফনের কাপড় বেঁধে লাইসেন্স করা অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেন। পুলিশ তাঁর অস্ত্র জমা নেয় ও তাঁকে আটক করে, পরে ছেড়ে দেয়। আইনগত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি; লাইসেন্স বাতিলের জন্য থানা জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদনও দেয়নি। ঈশ্বরদী থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অস্ত্রটি বৈধ, সেটি জমা রাখা হয়েছে; এর বাইরে তাঁরা আর কোনো প্রক্রিয়া নেননি।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের ২৯ জুন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তৎকালীন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ব্যাগে গুলির ম্যাগাজিন পাওয়া যায়। তবে ঘটনা ওই পর্যন্তই ছিল।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এমন ঘটনা কয়েকবার ঘটেছে। ২০২৩ সালের ২২ মে বাঁশখালীতে দলটির তৎকালীন এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী সমাবেশের পর আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মিছিলে অংশ নেন; লাইসেন্স বৈধ জানিয়ে পুলিশ ব্যাখ্যা চাইলেও লাইসেন্স বাতিল হয়নি। একই বছরের ৬ জুন বোয়ালমারীতে বাসাভাড়া নিয়ে বিরোধে অস্ত্র প্রদর্শনের অভিযোগ ওঠে কৃষক লীগ নেতা গোলাম কবিরের বিরুদ্ধে; পুলিশ অস্ত্র জব্দ করলেও তদন্ত শেষে ফেরত দেয়।
২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর পল্লবীতে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভের সময় আগ্নেয়াস্ত্র হাতে দেখা যায় যুবলীগ নেতা আওলাদ হোসেন ওরফে লাক্কুকে; তাঁর নামে দুটি অস্ত্রের লাইসেন্স ছিল, তবু ব্যবস্থা হয়নি। ২০২৪ সালের নভেম্বরে নান্দাইলে সাবেক এমপি আবদুস সালামের জামাতার দেহরক্ষী হিসেবে পরিচিত কামরুজ্জামান অস্ত্র হাতে মিছিলে অংশ নেন; তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা হয়নি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কাঁঠালিয়ায় সাবেক এমপি শাহজাহান ওমরের লাইসেন্স করা বন্দুক ছিল স্থানীয় বিএনপি নেতা আবদুল জলিল মিয়াজীর হাতে; নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি শাহজাহান ওমরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলেও পুলিশ ব্যবস্থা নেয়নি। ভেড়ামারায় বিয়ের অনুষ্ঠানে শটগান উঁচিয়ে গুলি করা এবং বগুড়া-৭ আসনের তৎকালীন এমপি রেজাউল করিম বাবলুর আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ছবি ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায়ও কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হয়নি, লাইসেন্সও বাতিল হয়নি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর ফারুক বলেন, লাইসেন্স থাকা মানেই যেকোনো পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে প্রদর্শনের অনুমতি থাকা নয়। এসব বন্ধ করতে আইনের শাসন, বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা উচিত এবং কারা লাইসেন্স পাচ্ছেন, তা ভালো করে যাচাই করা প্রয়োজন। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে অস্ত্র বহন আর জনসমক্ষে তা প্রদর্শন করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এক বিষয় নয়।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) মোহাম্মদ ওসমান গনি বলেন, কোথাও লাইসেন্সধারী শর্ত ভঙ্গ করলে তাঁরা জেলা প্রশাসককে প্রতিবেদন দিয়ে জানান; জেলা প্রশাসক সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেন। ইশরাকের ঘটনায় পুলিশ প্রতিবেদন দেবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত এখনো তাঁর জানা নেই বলে তিনি জানান।
পুলিশের বিশেষ শাখার তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৩ হাজার ৭০২টি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে—ব্যক্তির নামে ৪৮ হাজার ২৮৩টি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নামে চার হাজার ৮৫৪টি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৬৫টি। রাজনীতিকদের নামে লাইসেন্স রয়েছে ১৪ হাজার ২৩৫টি, যার মধ্যে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের ১১ হাজারের বেশি। শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালে মোট ১৯ হাজার ৫৯৪টি লাইসেন্স দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেকেই অস্ত্র জমা দেননি; তাই সেই আমলে দেওয়া লাইসেন্স বাতিল ও অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করা শুরু করেছে সরকার। ইশরাকের পদত্যাগে বিতর্ক আপাতত থামলেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে—আগের ঘটনাগুলোর মতো এবারও কি তদন্তেই সব শেষ হবে, নাকি লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গের সাজা এবার সত্যিই কার্যকর হবে।






