সহিংসতায় উত্তাল ফ্রান্স, চার শহরে দুই রাতের আংশিক কারফিউ জারি
দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরকারি সেবার অবনতি এবং আবাসনসংকট ঘিরে চলা বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স। সবচেয়ে বেশি সহিংসতার পর দেশটির উত্তরাঞ্চলের লিলসহ চার শহরে সোমবার রাত আটটা থেকে মঙ্গলবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত এবং মঙ্গলবার রাত আটটা থেকে বুধবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত আংশিক কারফিউ জারি করেছে সরকার।
গত শনিবার ফ্রান্সজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। অনেক জায়গায় কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে হলেও পরে তা সহিংস হয়ে ওঠে। সরকারি ভবনে আগুন দেওয়া হয়, দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চলে। রাস্তাজুড়ে ছিল ধিকিধিকি আগুনের ধোঁয়া আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভাঙা কাচ।
শনিবারের বিক্ষোভ থেকে আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রায় এক হাজার নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। পুলিশের একটি ভিড় নিয়ন্ত্রণকারী গ্রেনেডে এক বিক্ষোভকারীর হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়েছে। বাণিজ্য সংগঠনের হিসাবে ক্ষয়ক্ষতি কয়েক শ মিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছাতে পারে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শুধু রাজধানী প্যারিসেই তিন শ থেকে চার শ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়েছে; শহরের অভিজাত দোকানগুলোর দরজা-জানালার কাচও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুর কার্যালয়ের বরাতে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চলের চার শহরে দুই রাতের জন্য আংশিক কারফিউ থাকবে, যার একটি লিল। স্থানীয় সময় রাত আটটা থেকে সকাল ছয়টা পর্যন্ত বিধিনিষেধের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্যারিসজুড়ে একসঙ্গে কারফিউ জারির সম্ভাবনা নাকচ করেছেন লেকর্নু।
সোমবার মন্ত্রীদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আমি পুরোপুরি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে জরুরি অবস্থা জারি করা যেতে পারে বলেও জানান তিনি।
মার্সেই শহরে সোমবার দুপুর থেকে রাত আটটা পর্যন্ত জনসমাবেশ ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ — এটি কারফিউ নয়, সমাবেশের ওপর আলাদা নিষেধাজ্ঞা। উত্তরাঞ্চলের দেনাঁ শহরেও আগে কারফিউ ঘোষণা করে পরে তা নির্দিষ্ট এলাকায় অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সীমিত করা হয়েছিল।
ফ্রান্সে গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে শিক্ষকসংকট ও স্কুলের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। পরে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরকারি সেবার মান নিয়ে ক্ষুব্ধ অন্যরাও যোগ দেন। মার্চের পর দেশটিতে ডিজেলের দাম প্রায় ৪০ শতাংশ এবং পেট্রলের দাম ২৫ শতাংশ বেড়েছে। শনিবারের সহিংসতা মোকাবিলায় প্রায় ৬০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল।
তবু প্যারিস, মার্সেই ও লিওঁর মেয়ররা নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়ে সরকারের কাছে জবাব চেয়েছেন। ফরাসি দৈনিক লিবারাসিওঁতে সোমবার প্রকাশিত এক যৌথ লেখায় তারা লিখেছেন, ‘শনিবার প্রথমবারের মতো আমাদের মনে হয়েছে, আমাদের শহরগুলোর বিস্তীর্ণ অংশ কোনো সুরক্ষা ছাড়াই ফেলে রাখা হয়েছে।’
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ পদত্যাগ করতে চাইলেও প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ তা গ্রহণ করেননি। রোববার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মাখোঁ সহিংসতার নিন্দা জানান এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িতদের আলাদা করে দেখার ওপর গুরুত্ব দেন। নিজ দেশে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই সোমবার জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কুয়েত সফরের মধ্য দিয়ে তিন দিনের উপসাগরীয় সফর শুরু করেন মাখোঁ; তার সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কাতারও রয়েছে।
ফ্রান্সের ডিজিটালবিষয়ক মন্ত্রী আন ল্য হেনানফ সোমবার অভিযোগ করেন, সপ্তাহান্তে লুট হওয়া পণ্য অনলাইনের কয়েকটি প্ল্যাটফর্মে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। এসব বিজ্ঞাপন দ্রুত সরানোর আহ্বান জানান তিনি। ভিনটেড, অ্যামাজন, ইবে, লেবনকোয়াঁ, মেটা ও টিকটকের প্রতিনিধিদের আলোচনায় ডাকা হয়েছে। ভিনটেড জানিয়েছে, সন্দেহজনক বিজ্ঞাপন সরাতে তারা কাজ করছে; ইবে বলেছে, লুটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপন বেড়েছে কি না তারা নিশ্চিত করতে পারছে না।
সোমবার বিক্ষোভকারীরা প্যারিসের ল্যুভর জাদুঘরের প্রবেশপথ আটকে দেন। দীর্ঘ উড়োজাহাজযাত্রা শেষে এসে জাদুঘর বন্ধ পান অস্ট্রেলীয় পর্যটক অ্যান বোল্যান্ড; অন্য পর্যটকদের উদ্দেশে তার পরামর্শ, ‘বাড়িতেই থাকুন!’ ফ্রান্সে আসা নেদারল্যান্ডসের পর্যটক পিটার বলেন, রাস্তায় আগুনে পোড়া আবর্জনা ও ভাঙা কাচ দেখে তার মনে হয়েছে, তিনি যেন ‘যুদ্ধক্ষেত্রে’ ঘুরছেন।
শুধু ফ্রান্স নয়, ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশেও ক্ষোভ ছড়িয়েছে। ইতালির মিলানে শনিবার ও রোববার পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়েছে; রোববার মিলানে ২৭১ জনকে থানায় নেওয়া হয়, তাদের মধ্যে ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, বিক্ষোভ করার অধিকার আছে, কিন্তু শহরে আগুন লাগানোর অধিকার নেই।
স্পেন ও পর্তুগালে বাড়িভাড়ার চাপ ও আবাসনসংকটের প্রতিবাদে মানুষ তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান করছেন; বেলজিয়াম ও আলবেনিয়াতেও বিক্ষোভ সহিংস হয়েছে। দেশভেদে দাবি আলাদা হলেও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ অনেক আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে।
পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোর ওপর। ইয়েলো ভেস্টস আন্দোলন আগামী শনিবার আবার বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে, আর শ্রমিক সংগঠনগুলো ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এদিকে ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশ নিজেদের নাগরিকদের বড় জমায়েত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।





