ভোট জালিয়াতির অভিযোগে ক্যালিফোর্নিয়ায় ২৮ গ্রিন কার্ডধারীর বিরুদ্ধে মামলা মার্কিন বিচার বিভাগের
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ক্যালিফোর্নিয়ায় ২৮ জন গ্রিন কার্ডধারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ এনেছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা জালিয়াতির মাধ্যমে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেছেন এবং অবৈধভাবে ব্যালট দিয়েছেন।
এই পদক্ষেপকে অভিযুক্ত অ-নাগরিক ভোটের বিরুদ্ধে ফেডারেল সরকারের চলমান তৎপরতার আরও একটি ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডেমোক্র্যাট ও ভোটাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই তৎপরতা আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে সন্দেহ ছড়ানোর কৌশলের অংশ।
সোমবার বিচার বিভাগ জানায়, ক্যালিফোর্নিয়াজুড়ে ২৮ জন অ-নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে নাগরিকত্বের আবেদনে মিথ্যা বিবৃতি দেওয়া এবং জালিয়াতির মাধ্যমে ভোটার নিবন্ধন করা — এমন অপরাধ, যার শাস্তি পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। অভিযুক্তরা সবাই বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা; যুক্তরাষ্ট্রে তাদের বৈধ মর্যাদা থাকলেও নাগরিক না হওয়ায় ভোট দেওয়ার অনুমতি তাদের নেই।
বিচার বিভাগের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, অভিযুক্ত ২৮ জনের মধ্যে ২১ জন অবৈধভাবে ব্যালট দিয়েছেন। ইতোমধ্যে ১১ জনকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং গ্রেপ্তার অভিযান চলছে। অভিশংসকদের অভিযোগ, অভিযুক্তরা ভোটার নিবন্ধনের আবেদনে শপথ করে মিথ্যা বলেছেন।
প্রসঙ্গটি সংবেদনশীল কারণ, অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল বলে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন। তাদের উদ্বেগ, বিচার বিভাগের এ ধরনের তৎপরতা শেষ পর্যন্ত মার্কিন নাগরিকদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই গ্রেপ্তারের কয়েক দিন আগেই বিচার বিভাগ ক্যালিফোর্নিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করেছে — উচ্চ ঝুঁকির নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নির্দিষ্ট কিছু ব্যালট গণনা থেকে রাজ্যকে বিরত রাখতে আদালতের নির্দেশ চেয়ে। তার আগে বিভাগটি লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে একটি থাম্ব ড্রাইভ পাঠিয়েছিল, যাতে অবৈধভাবে নিবন্ধিত বলে দাবি করা অ-নাগরিকদের নাম ছিল বলে বলা হয়।
বিচার বিভাগ ক্যালিফোর্নিয়ার কর্মকর্তাদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিশ্চিত করতে বলেছিল, তালিকার ব্যক্তিরা নাগরিক কি না, এবং যাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত হবে না, তাদের ব্যালট আলাদা করে রাখতে বলেছিল। মামলায় বিভাগটি বলেছে, তারা রাজ্য কর্মকর্তাদের কাছে ২০ হাজারের বেশি মানুষের একটি তালিকা পাঠিয়েছে, যাদের ফেডারেল সরকার ‘সম্ভাব্য অ-নাগরিক’ বলে মনে করে এবং যাদের ডাকযোগে ব্যালট পাঠানো হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার সেক্রেটারি অব স্টেট শার্লি ওয়েবার বিচার বিভাগের এই দাবিগুলোকে ‘জঘন্য’ বলে নিন্দা করেছেন। তার ভাষায়, ফেডারেল কর্মকর্তারা মাসের পর মাস ধরে রাজ্যে কথিত ভোট জালিয়াতি নিয়ে ‘অস্পষ্ট ও ভিত্তিহীন অভিযোগ’ করে আসছেন। গত সপ্তাহে বিচার বিভাগকে লেখা চিঠিতে ডেমোক্র্যাট ওয়েবার উল্লেখ করেন, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ (ডিএইচএস) জুলাইয়ে প্রথম দাবি করেছিল, রাজ্যের ১ লাখ ৯০ হাজারের বেশি নিবন্ধিত ভোটার ‘হতে পারেন’ অ-নাগরিক; পরে সেই সংখ্যা কমিয়ে ২০ হাজারে আনা হলেও তথ্য ও পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে তারা অস্বীকার করে আসছে।
ওয়েবারের মতে, বিচার বিভাগের তালিকার হাজার হাজার ভোটারকে উল্টোটি প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত অযোগ্য মনে করা ফেডারেল আইনের লঙ্ঘন হবে, কারণ ফেডারেল নির্বাচনের আগে রাজ্যগুলোর পক্ষে পরিকল্পিতভাবে অযোগ্য ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া নিষিদ্ধ। রাজ্যের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ক্যালিফোর্নিয়ায় নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ২ কোটি ৩১ লাখ।
লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি বোর্ড অব সুপারভাইজরসের সদস্য জ্যানিস হান বলেছেন, ‘এটি ভোটারদের ভয় দেখানো এবং আমাদের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রতি আস্থা নষ্ট করার প্রকাশ্য চেষ্টা। ব্যাপক ভোট জালিয়াতির একটি চিত্র আঁকতে এই গ্রেপ্তারগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে, অথচ আমরা জানি বাস্তবতা তা নয়। ক্যালিফোর্নিয়ায় নির্বাচনের অখণ্ডতা রক্ষায় আইন রয়েছে এবং লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি সেগুলো পুরোপুরি মেনে চলছে।’
অন্যদিকে, ভারপ্রাপ্ত মার্কিন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ট্রেন্ট ম্যাককটার স্বীকার করেছেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় কথিত অ-নাগরিক ভোটারদের সরকারি তালিকাটি নির্ভুল নাও হতে পারে। পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাপ দেওয়া হলে তিনি বলেন, ‘তালিকায় এমন কিছু নাম থাকতে পারে, যারা শেষ পর্যন্ত নাগরিক বলেই প্রমাণিত হবেন। আমরা নিখুঁত নই, আর সেই কারণেই আমরা ক্যালিফোর্নিয়াকে সহযোগিতা করতে বলেছি।’
সরকারের বদলাতে থাকা হিসাব প্রসঙ্গে ম্যাককটার বলেন, ‘এভাবে ভাবুন — ১ লাখ ৯০ হাজার হলো ঊর্ধ্বসীমা, ২০ হাজার হলো নিম্নসীমা। ২০ হাজার হলো তারা, যাদের ব্যাপারে আমরা সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী... ১ লাখ ৯০ হাজারের মধ্যে রয়েছে ‘মাঝারি আত্মবিশ্বাস’, ‘কম আত্মবিশ্বাস’ — প্রাথমিক বাছাই, যা এখনো হাতে যাচাই করা হয়নি।’
সোমবার প্রকাশিত আদালতের নথি থেকে ধারণা মেলে, অভিযুক্তদের অন্তত কেউ কেউ নিজেদের যোগ্যতা নিয়ে বিভ্রান্ত ছিলেন। কয়েকজন তদন্তকারীদের সঙ্গে স্বেচ্ছায় সাক্ষাৎকারে রাজি হন এবং তখন তারা নাগরিকত্বের আবেদন প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলেন।
একজন অভিযুক্ত, এরিক রোনালদো সোতো, তদন্তকারীদের বলেন, একটি সুপারমার্কেটের বাইরে প্রচারকদের সাহায্যে তিনি ভোটার নিবন্ধন করেছিলেন। ১৯৭৬ সাল থেকে বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা সোতো জানান, স্ত্রীকে নিয়ে ভোট দিতে গেলে নির্বাচনকর্মীরা তাকে ব্যালট দিতে চান কি না জিজ্ঞেস করেন; তিনি নাগরিক নন বলে জানালে তাকে বলা হয়, ঠিক আছে, কারণ তারা যাচাই করে দেখবেন ব্যালটটি বৈধ কি না। ফেডারেল আদালতে জমা দেওয়া এক তদন্তকারীর হলফনামা অনুযায়ী, সোতো বলেন, কাকে ভোট দেবেন জানতেন না বলে তিনি খালি ব্যালট দিয়েছিলেন। তদন্তকারীরা আরও দাবি করেছেন, ১৯৯২ সালে মেক্সিকো থেকে দেশে ফেরার সময় সোতো একবার নাগরিক হওয়ার মিথ্যা দাবি করেছিলেন।
আরেক অভিযুক্ত হোসে প্রোবিতসাদো আমারো ১৯৯৩ সাল থেকে বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা বলে আদালতের নথিতে বলা হয়েছে। তিনি তদন্তকারীদের বলেন, ভোটার নিবন্ধন করার কথা তার মনে নেই, তবে ২০২৪ সালে ব্যালট পাওয়ার কথা স্বীকার করেন — ক্যালিফোর্নিয়া প্রত্যেক নিবন্ধিত ভোটারকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডাকযোগে ব্যালট পাঠায়। তদন্তকারীর লেখা অনুযায়ী, ‘ক্যালিফোর্নিয়া ও অর্থনীতির অবস্থা দেখে তিনি তা পূরণ করে সই করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নিশ্চিত করেন, খারাপ উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি বলেন, দোষী হলে তিনি তা স্বীকার করেন। তিনি মিথ্যা বলেন এমন মানুষ নন। তিনি কাউকে প্রতারণা করতে চাননি।’
অভিযুক্তদের আরেকজন ৬১ বছর বয়সী টোঙ্গার নাগরিক, যিনি ১৯৬৯ সাল থেকে বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা। অভিশংসকদের দাবি, তিনি ২০২৪ সালে নিবন্ধন করে ভোট দেন এবং এ বছর নাগরিকত্বের আবেদন করেন। আবেদনে তিনি বলেন, তিনি কখনো মিথ্যাভাবে মার্কিন নাগরিক হওয়ার দাবি করেননি।
অভিযুক্তরা কীভাবে নিবন্ধিত হলেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ক্যালিফোর্নিয়া এমন অনেক রাজ্যের একটি, যেখানে স্বয়ংক্রিয় ভোটার নিবন্ধন চালু আছে — ডিএমভির সঙ্গে লেনদেনের সময় ভোটাররা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত না নিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হয়ে যান। অভিযুক্তদের আইনজীবী আছেন কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি; ফেডারেল পাবলিক ডিফেন্ডারের কার্যালয় এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
ম্যাককটার শুক্রবার নির্বাচন কর্মকর্তাদের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে হুমকি দিয়েছেন, কোনো কর্মকর্তা অ-নাগরিকের ব্যালট গণনা করলে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হুমকির আইনি ভিত্তি দুর্বল এবং এটি কর্মকর্তাদের ভয় দেখানোর প্রকাশ্য চেষ্টা। সোমবার একজন সাংবাদিক জানতে চাইলে ম্যাককটার বলেন, ‘জেনেশুনে’ কাউকে অবৈধভাবে ভোট দিতে সাহায্য করলে অভিযোগ আনা যেতে পারে: ‘এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আইনি নীতি — সহায়তা ও প্ররোচনা।’
অন্যান্য রাজ্যে কথিত অ-নাগরিক ভোটার শনাক্তের ফেডারেল চেষ্টা আগেও হোঁচট খেয়েছে। গত মাসে নেভাদা রাজ্যের কর্মকর্তারা জানান, ডিএইচএস ভুলভাবে রাজ্যের ভোটার তালিকার ১৮৫ জনকে অ-নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করেছিল। বিচার বিভাগ সোমবার আরও জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ফেডারেল অভিশংসকেরা ২০টি রাজ্যে মোট ১১২ জনের বিরুদ্ধে কথিত নিবন্ধন অপরাধ ও অবৈধ ভোটের অভিযোগ এনেছেন — ক্যালিফোর্নিয়ার এই মামলা সেই বিস্তৃত তৎপরতারই অংশ।





