যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তা ঠিকমতো না পেয়ে মরছেন ইউক্রেনীয়রা, জেলেনস্কির উপদেষ্টার বিস্ফোরক দাবি
রাশিয়ার আসন্ন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নির্ভরযোগ্য সতর্কবার্তা না পাওয়ায় ইউক্রেনীয়দের মৃত্যু হচ্ছে বলে দাবি করেছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির এক গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা। তাঁর ভাষায়, মানুষ ইতিমধ্যে প্রাণ হারিয়েছে।
জেলেনস্কির উপদেষ্টা সেরহি ‘ফ্ল্যাশ’ বেসক্রেস্তনভ বিবিসিকে বলেছেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিষয়ে নাগরিকদের সতর্ক করার সময় না পাওয়ায় প্রাণহানি ঘটেছে। তিনি বলেন, ‘এটা বিপজ্জনক... আমার মনে হয় এটা সত্যিই খুব খারাপ... মানুষ ইতিমধ্যে মারা গেছে।’
একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ইউক্রেনের স্টারলিংক ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধও চলমান রয়েছে। এই দুই বিষয় একসঙ্গে ঘটায় কিয়েভে সন্দেহ বাড়ছে যে এগুলো কাকতালীয় নয়।
তবে হোয়াইট হাউস বলেছে, ইউক্রেনের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। ওয়াশিংটনের এই অস্বীকৃতি সত্ত্বেও কিয়েভের অনেকের ধারণা, স্টারলিংক সমস্যার পেছনে ইচ্ছাকৃত কারণ থাকতে পারে।
গত সপ্তাহে ইউক্রেন প্রথম মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে বিঘ্নের কথা জানায়। রাশিয়ার তেল আমদানি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত চুক্তি ঘিরে দুই দেশের সম্পর্কে যখন নতুন করে টানাপোড়েন চলছে, তখনই এই ঘটনা ঘটে।
সোমবার সকালে জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, রাতভর রাজধানীতে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবর এসেছে; এর একটি এসেছে কোনো সতর্কবার্তা ছাড়াই, আর অন্যটির ক্ষেত্রে আশ্রয় নেওয়ার জন্য মিলেছিল খুব সামান্য সময়।
এর কয়েক ঘণ্টা আগেই এনবিসিকে দেওয়া জেলেনস্কির একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি বলেছিলেন তিন দিনের বিরতির পর গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান আবার শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এর জন্য আমরা খুবই কৃতজ্ঞ। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের কাছেই এই অনন্য গোয়েন্দা সক্ষমতা আছে, যা দিয়ে তারা আমাদের জানাতে পারে রাশিয়া কখন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে।’
কিন্তু বেসক্রেস্তনভ বিবিসিকে বলেছেন, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য এখনো অসম্পূর্ণ ও অনিয়মিত আসছে এবং যুক্তরাষ্ট্র এই সমস্যার স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যাও দেয়নি। তিনি বলেন, ‘এটা খুব অদ্ভুত দেখাচ্ছে। কখনো আমরা হামলার আগে এই তথ্য পাই, আবার কখনো পাই না।’ তাঁর ভাষায়, গত রাতে তথ্য এসেছিল, তবে হামলার মাত্র এক মিনিট আগে।
তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা চলছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, গোয়েন্দা তথ্য আসতেই আছে; সমস্যাটি শুধু বিমান হামলার সতর্কবার্তার অংশটি নিয়েই।
স্টারলিংক প্রশ্নেও অস্পষ্টতার কথা বলেছেন বেসক্রেস্তনভ। স্টারলিংকের সামরিক সেবা স্টারশিল্ড, যা দিয়ে কিয়েভ ড্রোন, হেলিকপ্টার ও সামরিক যোগাযোগের সংযোগ দেয়, তার ওপর চলমান বিধিনিষেধের জন্য কে দায়ী, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কোনো স্পষ্টতা দেয়নি বলে জানান তিনি।
গত সপ্তাহে স্টারশিল্ড চলমান ইউনিটগুলোর গতি সীমিত করে দেয়; নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকা অবস্থায় সেগুলো ঘণ্টায় ১০০ মাইল (১৬০ কিলোমিটার) গতির বেশি যেতে পারছিল না। এতে আগত ড্রোন ভূপাতিত করা কিংবা রুশ-অধিকৃত এলাকায় মাঝারি পাল্লার ড্রোন হামলা চালানোর সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে ইউক্রেনের।
স্টারলিংকের মালিক ইলন মাস্ক গত সপ্তাহে বলেছিলেন, স্টারশিল্ডের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত মার্কিন সরকারের হাতেই, কারণ এটি পেন্টাগনের জন্য তৈরি করা হয়েছিল; অর্থাৎ বিধিনিষেধের পেছনে মার্কিন সরকার থাকতে পারে বলেই ইঙ্গিত দেন তিনি। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এতে নিজের জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
বেসক্রেস্তনভ মনে করেন, দুটি বিষয়ের একসঙ্গে ঘটাটা সম্ভবত ইচ্ছাকৃতভাবে ইউক্রেনের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা। তিনি বিবিসি নিউজকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত বলতে চাইছে, রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে এবং সমঝোতা খুঁজতে হবে।
তিনি জানিয়েছেন, আসন্ন হামলা সম্পর্কে সীমিত সতর্কবার্তা দেওয়ার মতো নিজস্ব রাডার তথ্য ইউক্রেনের কাছেও আছে। তবে এখন বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহারের বিষয়টি জরুরিভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, শুধু আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য নয়, বাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ ও বেসামরিকদের জন্যও স্টারলিংকের বিকল্প ভাবতে হচ্ছে, কারণ ভবিষ্যতে স্টারলিংক নিয়ে কী ঘটবে, তা জানা নেই।
অন্যদিকে সোমবারই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানে কোনো ‘বিরতি’ হয়নি। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, জেলেনস্কি এসব কথা কোথা থেকে পাচ্ছেন বা কেন সংবাদমাধ্যমে বলছেন, তা তিনি জানেন না। রুবিও জানান, কয়েক রাত আগে ইউক্রেনের আগাম সতর্কব্যবস্থায় একটি সফটওয়্যার সমস্যা হয়েছিল বলে তিনি জানেন।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে গোয়েন্দা কার্যক্রমে কোনো পরিবর্তন হয়নি। গোয়েন্দা বিষয়ে আলোচনার জন্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করার দিকে মনোযোগী এবং যুক্তরাষ্ট্র অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি সহায়তা দিয়েছে ইউক্রেনকে। বিবিসি স্টারলিংকের মন্তব্যও চেয়েছে।






