বাজেট অচলাবস্থায় ইইউ, সামনে 'নিখুঁত রাজনৈতিক ঝড়': চার বৃহত্তম অর্থনীতিতেই ভোটের হাওয়া
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়েছে। গত সপ্তাহের শীর্ষ সম্মেলনে ব্রাসেলস বুঝতে পেরেছে, বাজেট চুক্তি—কিংবা অন্য যেকোনো বিষয়ে—ঐকমত্যে পৌঁছানো কতটা কঠিন হতে যাচ্ছে। দুই দিনের আলোচনা শেষে নেতারা দুই লাখ কোটি ইউরোর বাজেট নিয়ে কোনো অগ্রগতি করতে পারেননি; বরং জ্বালানি নীতিকে কেন্দ্র করে অপ্রত্যাশিত তিক্ত বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। সম্মেলনের সমাপনী বিবৃতিতে বছরের শেষের আগে বাজেটে ঐকমত্যে পৌঁছানোর কোনো উল্লেখই ছিল না।
সংকটের মূলে রয়েছে ইউরোপের চার বৃহত্তম অর্থনীতির একযোগে রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি হওয়া। স্পেন আগামী মাসে ভোটে যাচ্ছে, যেখানে কেন্দ্র-ডান ও চরম ডান জোট ক্ষমতায় আসার পথে বলে জরিপে ইঙ্গিত মিলছে। এপ্রিলে ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট বদল হচ্ছে, জরিপে এগিয়ে চরম ডানপন্থী নেত্রী মারিন ল্য পেন। জার্মানিতে উত্থান ঘটছে অল্টারনেটিভ ফর জার্মানির, যা ফ্রিডরিখ মের্ৎসের চ্যান্সেলরশিপকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। আর ২০২৭ সালে নির্বাচনের মুখে জর্জিয়া মেলোনির অস্বাভাবিক দীর্ঘস্থায়ী ইতালীয় সরকার।
সাইপ্রাসের প্রেসিডেন্ট নিকোস ক্রিস্টোদুলিদেস গত সপ্তাহে ইউরোপীয় কাউন্সিলের ফাঁকে পলিটিকোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, 'আগে সবাই বুঝত, বছরের শেষের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।' কিন্তু স্পেনের নির্বাচনের অর্থ হলো সেটি আর সম্ভব হবে না। তাঁর ভাষায়, আগামী বছর 'ফ্রান্স, ইতালি'সহ অন্যরা ভোটে যাবে, যা জোটের জন্য আরও জটিলতা ডেকে আনবে।
সম্মেলনের হতাশা ছিল স্পষ্ট। পলিটিকো ছয়জন কূটনীতিক ও কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে, যাঁরা আগামী মাসগুলোতে ইইউর সামনে কঠিন পরিস্থিতির সতর্কবার্তা দিয়েছেন। এক জ্যেষ্ঠ ইইউ কূটনীতিক বলেন, 'আগামী বছর পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।' বাজেট আলোচনায় সমাজতন্ত্রী ও ডেমোক্র্যাটদের সহ-নেতা জ্যেষ্ঠ এমইপি কার্লা তাভারেস বলেন, নির্বাচনী ক্যালেন্ডারের কারণে 'আগামী বছর সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে এবং ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ভেতরে পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে।'
ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ একাধিক ফ্রন্টে বাড়ছে, এমন সময়ে জোটের অভ্যন্তরীণ অচলাবস্থা আর খারাপ সময়ে আসতে পারত না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক জোটকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে, আর রাশিয়া ইউরোপজুড়ে ছায়াযুদ্ধ চালাচ্ছে—সাইবার হামলা ও নাশকতা থেকে শুরু করে লাইপজিগ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার চেষ্টা, যার জন্য বার্লিন ক্রেমলিনকে দায়ী করেছে। বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজের আঁকড়ি শক্ত করছে এবং সস্তা রপ্তানিতে ইউরোপীয় বাজার ভাসিয়ে দিচ্ছে।
বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডি ওয়েভার সম্মেলনের সময় সাংবাদিকদের বলেন, 'তারা আমাদের বিভক্তি চায়। তারা আমাদের বিভক্তি চায়।' নাম না নিলেও তিনি ব্রাসেলসের পূর্ব ও পশ্চিমের দেশগুলোর দিকে ইঙ্গিত করছিলেন। 'এবং তাদের অবশ্যই এমন জায়গা আছে যেখানে তারা আমাদের আঘাত করতে পারে।' লিথুয়ানিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী গ্যাব্রিয়েলিয়াস ল্যান্ডসবার্গিস আরও খোলাখুলি বলেন, 'এখন আমরা তিন দিক থেকে আক্রমণের মুখে: যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন থেকে।'
তার ওপর রয়েছে ইউক্রেন সমস্যা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবে, আগামী বছর ইউক্রেনের বাজেট ঘাটতি ৩০ থেকে ৩৫ বিলিয়ন ডলার—রাশিয়া নৃশংস শীতের আগে দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়ার পর। অথচ ইইউ ইতিমধ্যে গত বছর ৯০ বিলিয়ন ইউরো দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আগামী মাসগুলো কিয়েভের জন্য 'চরম ভয়াবহ' দেখাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন ল্যান্ডসবার্গিস। 'সবকিছু ইউরোপের কাঁধে পড়ছে।'
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গত সপ্তাহের সম্মেলনে সাংবাদিকদের কাছে হতাশার সুরে বলেন, ইউক্রেন পড়ে গেলে দুই কোটি ইউক্রেনীয় ইইউতে ঢুকে পড়বে। 'রাশিয়া আমাদের হত্যা করছে,' তিনি বলেন। 'তারা থামতে চায় না।' ইউক্রেনের তহবিল সংকটের একটি সমাধান হতে পারে ব্রাসেলসভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউরোক্লিয়ারে আটকে থাকা ২০০ বিলিয়ন ইউরোর রুশ সম্পদ। কিন্তু বেলজিয়াম, যে আগের প্রচেষ্টায় ভেটো দিয়েছিল, এখনও নড়ছে না।
সম্ভাব্য অন্যান্য সমাধান, যেমন আরও যৌথ ঋণ ইস্যু করা, বিশৃঙ্খল সমঝোতা দাবি করবে—ঠিক তখনই, যখন ব্রাসেলসের হাতে আরও কম জায়গা। ইইউর সমস্যা শুধু বাজেট বা পৃথক নীতিমালার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইউরোপের বেশ কয়েকজন শক্তিশালী নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায়, সমঝোতা করতে প্রয়োজনীয় স্থিতিশীল জোট ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নেতাদের হারানোর ঝুঁকিতে ব্রাসেলস। এক ইইউ কূটনীতিকের মন্তব্য, 'এখন আমাদের এমন ইউরোপ, যার কোনো স্পষ্ট নেতা নেই।'
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সাংবিধানিকভাবে টানা তৃতীয় মেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না; এপ্রিলে এলিসি প্রাসাদ ছাড়ার পর প্যারিসে নতুন ঠিকানা খুঁজতে হবে তাঁকে। গত সপ্তাহের সম্মেলনে বন্ধ দরজার আলোচনায় মাখোঁ স্বীকার করেন, ক্ষমতায় তাঁর শেষ মাসগুলোতে বাজেট চুক্তিতে স্বাক্ষর করার রাজনৈতিক ম্যান্ডেট তাঁর থাকবে না।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ আট বছর ক্ষমতায় থাকার পর জরিপ অনুযায়ী পরাজয়ের মুখে। স্প্যানিশরা ২৯ নভেম্বর ভোট দেবে, অর্থাৎ ১৩ ও ২৬ নভেম্বরের ইইউ নেতাদের বৈঠকে সানচেজ থাকবেন পূর্ণ নির্বাচনী মোডে। যেভাবেই হোক, জানুয়ারির আগে মাদ্রিদে সরকার গঠনের আশা নেই, যা দুইজন ইইউ কূটনীতিকের মতে বাজেট আলোচনাকে লাইনচ্যুত করতে পারে।
জানুয়ারিতে বাজেট পার করানোর একটি সুবর্ণ সুযোগ থাকতে পারে বলে মনে করেন এক জ্যেষ্ঠ ইইউ কর্মকর্তা। ইউরোপের রাজনৈতিক অস্থিরতা সমঝোতাকে আরও কঠিন করে তোলার আগে এটাই হতে পারে চুক্তির শেষ সুযোগ। ইউরোপীয় পিপলস পার্টির বাজেট সহ-নেতা সিগফ্রিড মুরেসান বলেন, 'এখন পর্যন্ত ইইউর নেতারা কেবল খুব ধীর ছিলেন। সময় ফুরিয়ে আসছে।'




