প্রতিদিনের কাজে ‘বিসমিল্লাহ’র সাত শিক্ষা: শুধু উচ্চারণে নয়, আচরণেও প্রতিফলনের আহ্বান
‘বিসমিল্লাহ’ মুসলমানদের মুখে উচ্চারিত সবচেয়ে পরিচিত বাক্যগুলোর একটি। এর অর্থ ‘আল্লাহর নামে শুরু করছি’। কোনো কাজের শুরুতে এই বাক্য উচ্চারণের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহকে স্মরণ করে, তাঁর সাহায্য ও বরকত কামনা করে। তবে এই বাক্যের শিক্ষা শুধু মুখের উচ্চারণে সীমাবদ্ধ না রেখে কাজ-কর্মেও প্রতিফলিত হওয়া উচিত—কোরআন-হাদিসের আলোকে এমন সাতটি শিক্ষার কথা তুলে ধরা হয়েছে এক লেখায়। লেখক ফয়জুল্লাহ রিয়াদ ঢাকার রাজাবাড়ীর জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহর শিক্ষক।
প্রথম শিক্ষা হলো সামর্থ্য ও সুযোগের উৎস সম্পর্কে সচেতনতা। মানুষ সাধারণত কাজ শুরু করে নিজের পরিকল্পনা ও সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে; কিন্তু বিসমিল্লাহ স্মরণ করিয়ে দেয়, সামর্থ্য ও সুযোগ সবই আল্লাহর দান। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন’ (সুরা আলাক, আয়াত: ১)। ওহির প্রথম নির্দেশেই পড়ার কাজকে প্রতিপালকের নামের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, যা জ্ঞানচর্চাসহ কল্যাণকর কাজে আল্লাহকে স্মরণের শিক্ষা দেয়।
দ্বিতীয় শিক্ষা যাত্রা ও কাজের পুরো পথে আল্লাহর ওপর নির্ভরতা। মহাপ্লাবন শুরুর আগে নৌযানে ওঠার সময় নুহ (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘তোমরা এ নৌকায় আরোহণ করো, আল্লাহর নামেই এর চলা ও নোঙর করা’ (সুরা হুদ, আয়াত: ৪১)। অর্থাৎ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নির্ভরতা থাকবে আল্লাহর ওপর; আর আল্লাহর নাম নেওয়ার অভ্যাস শয়তানের প্ররোচনার বিরুদ্ধে মনকে সজাগ রাখে।
তৃতীয় শিক্ষা হলো কাজের বৈধতা যাচাই করা। আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করলেই কোনো কাজ বৈধ হয়ে যায় না; কাজটি ইসলামে বৈধ কি না, তা আগে দেখতে হবে। খাদ্যের ক্ষেত্রে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে মানুষ, পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র, তা থেকে আহার করো’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬৮)। উপার্জনের ক্ষেত্রে এই সতর্কতা আরও জরুরি, কারণ জীবনযাপন ও ইবাদতের শুদ্ধতা এর ওপর নির্ভর করে—ব্যবসা, চাকরি বা অন্য পেশায় সুদ, ঘুস, আত্মসাৎ ও প্রতারণা থেকে বেঁচে থাকা তাই অপরিহার্য।
চতুর্থ শিক্ষা আমানত রক্ষা করা। আল্লাহর নাম নিয়ে শুরু করা কাজ সম্পাদনেও তাঁর বিধান মেনে চলা জরুরি, আর তার অন্যতম দাবি আমানত রক্ষা। কোরআনে এসেছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৫৮)। আমানত মানে শুধু গচ্ছিত সম্পদ নয়—ব্যবসায়ী, শিক্ষক, চাকরিজীবী কিংবা প্রতিষ্ঠানপ্রধান, প্রত্যেকের ওপর অর্পিত দায়িত্বও আমানত। কর্মক্ষেত্রে ফাঁকি, দায়িত্বে অবহেলা, কারও প্রাপ্য আটকে রাখা বা ক্ষমতার অপব্যবহার সেই আমানতেরই খেয়ানত।
পঞ্চম শিক্ষা হলো প্রকৃত তাওয়াক্কুল বা ভরসা। ইসলাম পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টাকে অস্বীকার করে না; তবে নিজের যোগ্যতা ও উপকরণকেই চূড়ান্ত না ভেবে আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে শেখায়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট’ (সুরা তালাক, আয়াত: ৩)। কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা এই ভরসারই বহিঃপ্রকাশ; তবে ভরসার অর্থ চেষ্টা ছেড়ে দেওয়া নয়—বৈধ উপায়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করে ফলাফলের ভার আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেওয়াই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।
ষষ্ঠ শিক্ষা আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশা ও অন্যের প্রতি দয়া। বিসমিল্লাহর মধ্যে আল্লাহর দুটি গুণবাচক নাম আছে—আর-রহমান ও আর-রহিম, যেগুলো তাঁর ব্যাপক ও বিশেষ রহমতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি নিজের ওপর রহমত অবধারিত করে নিয়েছেন’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১২)। এই প্রত্যাশা মুমিনকে হতাশা থেকে দূরে রাখে; আর যে নিজে আল্লাহর রহমতের মুখাপেক্ষী, অন্যের প্রতি দয়া ও সহানুভূতি দেখানোও তার কর্তব্য।
সপ্তম দিকটি পারিবারিক শিক্ষা। ছোটোবেলা থেকে সন্তানকে আল্লাহর নাম নিতে শেখালে তার দৈনন্দিন জীবনে আল্লাহর স্মরণ জায়গা করে নেয়। ওমর ইবনে আবু সালামা (রা.) বলেন, শিশুকালে খাবারের পাত্রে তাঁর হাত চারদিকে ঘুরছিল; তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘হে বালক, আল্লাহর নাম নাও, ডান হাতে খাও এবং তোমার নিকটবর্তী অংশ থেকে খাও’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৭৬)। তবে শুধু মুখে বলতে শেখানো যথেষ্ট নয়—সত্যবাদিতা, হালাল-হারামের পার্থক্য, মানুষের অধিকার ও দায়িত্বের গুরুত্বও বোঝাতে হবে, আর বড়োদের আচরণ থেকেই শিশুরা সবচেয়ে বেশি শেখে।
এর সঙ্গে যুক্ত আরেকটি সতর্কতা হলো শরয়ি বিধান নিয়ে কথা বলায় সাবধানতা। নিজের ইচ্ছা বা সমাজের প্রচলনের ভিত্তিতে কোনো কিছুকে হালাল বা হারাম বলা যায় না। কোরআনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, মুখের সাধারণ কথায় আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করে ‘এটি হালাল, এটি হারাম’ বলা যাবে না (সুরা নাহল, আয়াত: ১১৬)। কোনো বিষয়ে বিধান জানতে হলে কোরআন, সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যার আশ্রয় নিতে হবে।
লেখায় শেষ পর্যন্ত যে লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে, তা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। কোরআনের ভাষ্যে, ‘বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু, সবই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১৬২)। ইবাদত যেমন আল্লাহর জন্য, জীবনের অন্য সব ক্ষেত্রেও তাঁর নির্দেশ মেনে চলাই মুমিনের লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে বার্তাটি একটাই—প্রতিবার বিসমিল্লাহ বলার সময় মনে রাখতে হবে, আল্লাহর নামে শুরু করা কাজ যেন তাঁর নির্দেশের পরিপন্থী না হয়। উচ্চারণের অভ্যাসের পাশাপাশি সততা, আমানতদারি, হালাল উপার্জন আর মানুষের অধিকার রক্ষার মধ্য দিয়েই সেই শিক্ষার পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে।


