যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ-পানির ব্যবস্থায় আগেই ঢুকে থাকতে পারে হ্যাকাররা, ‘ট্রোজান হর্স’ সতর্কতা বিশেষজ্ঞদের
ফ্রান্সের সুপারমার্কেটের ফ্রিজে সাইবার হামলার ঘটনা আমেরিকার জন্য অশুভ সতর্কবার্তা—এমনটাই বলছেন সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের শঙ্কা, হ্যাকাররা হয়তো ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য জরুরি অবকাঠামোর ভেতরে ‘ট্রোজান হর্সের’ মতো লুকিয়ে আছে, শুধু সক্রিয় হওয়ার অপেক্ষায়।
গত সপ্তাহে অজ্ঞাত হ্যাকাররা ফ্রান্সজুড়ে শত শত সুপারমার্কেটের রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। রাতের বেলা তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে তুলে দেওয়ায় প্রচুর খাদ্যপণ্য নষ্ট হয়ে যায় এবং ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় লাখ লাখ ডলার। বিশেষজ্ঞদের মতে, একই ধরনের ঘটনা আমেরিকাতেও ঘটতে পারে, আর শুধু মুদি দোকান নয়, আরও অনেক খাতকেই সতর্ক থাকতে হবে।
জার্মানভিত্তিক সফটওয়্যার কোম্পানি আইজেলের সরকার ও জরুরি শিল্পবিষয়ক জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ফিল্ড সিটিও জন ওয়ালশ বলেন, ‘ভাবুন, যদি সাত দিন আমাদের পানি না থাকে, অথবা তারা ফ্রিজে হামলা করে আর আমাদের খাবার না থাকে—মানুষের জন্য সেটা খুব কঠিন পরিস্থিতি হবে, আর তা থেকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। আমরা দেখছি, আমরা ঝুঁকির মধ্যে আছি এবং হামলায় ব্যবস্থাগুলো অচল হয়ে যাচ্ছে।’
আইজেলে ওয়ালশ সরকার এবং সিমেন্স ও রকওয়েলের মতো জরুরি অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালনাকারী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে কাজ করে তাদের পরিচালন নিরাপত্তা জোরদার করেন।
ফ্রান্সের ঘটনায় ডেনমার্কের বাণিজ্যিক রেফ্রিজারেশন ব্যবস্থা প্রস্তুতকারক ড্যানফস জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত ফ্রিজগুলোর অনেকই ছিল পুরোনো ব্যবস্থা, যেগুলো আর কোনো হালনাগাদ পায় না। ওয়ালশের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের জরুরি অবকাঠামোর বড় অংশেরও একইভাবে নতুন করে সাজানো দরকার।
১২ অক্টোবর পশ্চিম ফ্রান্সের নেভেজে ইন্টারমার্শে সুপারমার্কেটে খালি হয়ে যাওয়া তাজা খাবারের ফ্রিজের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক নারীর ছবিই বলে দেয় ক্ষতির চিত্র। ইন্টারমার্শে ও কো-অপারেটিভ ইউ চেইনের ওপর ওই হামলায় ফ্রিজগুলো গলে যেতে শুরু করেছিল।
ওয়ালশ বলেন, পরিচালন প্রযুক্তি বা ওটি পরিবেশে—খাদ্য উৎপাদন, ওষুধশিল্প, তেল বা ইউটিলিটি, যেখানেই হোক—একটি বড় বাধা হলো, এসব স্থাপনা ১৫ থেকে ২০ বছর পুরোনো সম্পদ দিয়ে চলে। তাঁর ভাষায়, ‘এই ব্যবস্থাগুলো ব্যয়বহুল, ভঙ্গুর এবং চলমান কার্যক্রমের জন্য অপরিহার্য।’
আরেকটি সমস্যা হলো মানসিকতা। কোম্পানিগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা বন্ধ করে সেগুলো হালনাগাদ ও আরও সুরক্ষিত করার ঝামেলায় যেতে চান না; তাঁরা চলেন ‘নষ্ট না হলে ঠিক করার দরকার নেই’—এই ধারণায়, বলেন ওয়ালশ।
অথচ জরুরি অবকাঠামো, আমেরিকান সমাজের প্রায় সবকিছুর মতোই, ক্রমে প্রযুক্তির সঙ্গে ও ডিজিটাল অবকাঠামোর ভেতরে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে কৌশল মৌলিকভাবে বদলাতে হচ্ছে।
ওয়ালশের পরামর্শ, এখন ভাবনার কেন্দ্র ‘নিরাপত্তা’ থেকে সরিয়ে ‘স্থিতিস্থাপকতা’ বা রেজিলিয়েন্সে নেওয়া দরকার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হ্যাকারদের আরও দক্ষ করে তুলছে, ফলে তাদের পুরোপুরি বাইরে আটকে রাখার চেষ্টা আর বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা মানে এক ধরনের আস্থা যে সব ঠিক আছে। আর স্থিতিস্থাপকতা হলো ধরে নেওয়া যে আক্রমণকারী উপস্থিত আছে—আর সে উপস্থিত থাকলে বিস্ফোরণের ব্যাসার্ধ, অর্থাৎ ক্ষতির পরিধি, আপনি নিয়ন্ত্রণে রাখেন।’
তাঁর সবচেয়ে বড় সতর্কতা ‘ট্রোজান হর্স’ নিয়ে। এমন একটি গোপন অনুপ্রবেশ হয়তো ইতিমধ্যেই আমেরিকার বৈদ্যুতিক গ্রিড ও অন্যান্য জরুরি অবকাঠামোর ভেতরে বসে আছে, প্রতিপক্ষের সক্রিয় করার অপেক্ষায়। ওয়ালশ বলেন, প্রতিপক্ষ ব্যবস্থা অচল করে দেওয়ার নমুনা দেখিয়েছে—যা এক অর্থে বাস্তব লক্ষ্যবস্তুতে অনুশীলন, নিজেদের দক্ষতা ও পদ্ধতি ঝালিয়ে নেওয়া এবং একই সঙ্গে বার্তা পাঠানো।
নীতিনির্ধারণী বিশেষজ্ঞরাও ভাবছেন, দৈনন্দিন জীবনের এত কিছু যখন ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত, তখন আইনপ্রণেতাদের জন্য সুপারিশ সাজানো কঠিন। ‘হিউম্যানস ফার্স্ট’ সংগঠনের চেয়ার অ্যামি ক্রেমার বলেন, ‘গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির ইন্টারনেটে প্রবেশাধিকার আছে—এতে আমি হতবাক। সুবিধাটা আমি বুঝি, কিন্তু একই সঙ্গে সম্ভাব্য সমস্যাও থাকবে। এটি সব আমেরিকানের জন্যই উদ্বেগের বিষয় হওয়া উচিত—শুধু যন্ত্রপাতি নয়, নেস্ট থার্মোস্ট্যাটের মতো ঘরের ডিভাইসও হ্যাক হতে পারে।’
ওয়ালশের দাবি, এ ধরনের হুমকির মুখে আমেরিকার জরুরি অবকাঠামো সত্যিই ঝুঁকিতে আছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ২০২৬ সালে মিনেসোটার পানি ব্যবস্থার ওপর সমন্বিত সাইবার হামলার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর কথায়, কেউ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ব্যাহত করতে বা সন্ত্রাসের মতো কার্যকলাপ শুরু করতে চাইলে সে পানি ও বর্জ্য পানির দিকেই যাবে, খাদ্য সরবরাহের দিকেও যাবে—ঠিক যা এখানে ঘটেছে, তবে আরও বড় পরিসরে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যজুড়ে একের পর এক হামলার একটি ধারা দেখা যাচ্ছে; সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যেন বিভিন্ন জায়গায় নিজের কৌশল অনুশীলন ও প্রদর্শন করছে, যা হতে পারে আরও সাহসী হামলার প্রস্তুতি। ওয়ালশের ভাষায়, ‘আমরা অবশ্যই বেশি ঝুঁকিতে আছি, তারা অবশ্যই আমাদের লক্ষ্য করছে; নাগরিক, সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শাসনব্যবস্থা দরকার, যাতে শিল্পগুলো এই সুরক্ষা বাস্তবায়নে বাধ্য হয়।’ এ বিষয়ে ড্যানফসের কাছে আরও মন্তব্য চাওয়া হয়েছে।





