পিটিয়ে হত্যার সাহস পায় কোথায়, রাষ্ট্র কি তবে মবের কাছে জিম্মি?
সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আমাদের সামনে এক ভয়াবহ প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে — এ দেশে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করার সাহস পায় কারা?
কোন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে একদল মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, একজন মানুষকে নির্যাতন করে হত্যা করে এবং রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থাকে কার্যত চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়? কেবল উপস্থিতিই কোনো অপরাধকে বৈধতা দেয় না — এই সহজ সত্যটা কেন বারবার ভুলে যেতে হয়?
সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শামীমকে প্রথম দফায় মারধরের পর চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও তাঁর ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়।
পরিবারের অভিযোগ, ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার ও লোকজনকে জড়ো করার মধ্য দিয়ে সহিংসতার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল।
হত্যার ঘটনার পর দায়ের করা মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত দুজনকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেছে।
এটি কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয় — রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব, আইনের শাসন এবং মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের ঘটনা। প্রথম দফায় হামলার পর একজন মানুষ চিকিৎসাধীন ছিলেন, তারপরও তাঁকে রক্ষা করা গেল না। এই পরিস্থিতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা এবং বিপন্ন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। একজন আহত মানুষ যদি হাসপাতালে নিরাপদ না থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা থাকে কোথায়?
প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই — যারা সংঘবদ্ধ হয়ে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করছে, তারা এমন সাহস পাচ্ছে কোথা থেকে? তারা কি মনে করছে, দলবদ্ধ হলে তাদের শনাক্ত করা যাবে না? ধর্মীয় আবেগকে সামনে আনতে পারলে অপরাধের দায় এড়ানো যাবে? নাকি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে তারা ধরে নিয়েছে, কিছুদিন উত্তেজনা চলবে, মামলা হবে, কয়েকজন গ্রেপ্তার হবে, তারপর সবকিছু আগের মতো হয়ে যাবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর অনুমান দিয়ে নয়, তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে দিতে হবে। কাউকে আগাম অপরাধী ঘোষণা করা উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু যারা সহিংসতার উসকানি দেয়, মানুষকে জড়ো করে, হামলায় নেতৃত্ব দেয়, কিংবা সরাসরি হত্যায় অংশ নেয় — তাদের প্রত্যেকের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অনলাইনে উসকানি দিয়ে জনতাকে সংগঠিত করা, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ ছড়িয়ে দেওয়া এবং তার পরিণতিতে সহিংসতার আশঙ্কা তৈরি হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কত দ্রুত পদক্ষেপ নেয়? সহিংসতা ঘটে যাওয়ার পর মামলা ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তা প্রতিরোধে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি? সাতক্ষীরার ঘটনা এসব প্রশ্নের জবাব দাবি করে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধীদের খুঁজে বের করা নয় — সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধ এবং বিপন্ন মানুষের জীবন রক্ষাও তার দায়িত্ব। বিশেষ করে, প্রথম দফার হামলার পর শামীমের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু অভিযোগ সত্য কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালত ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ার, কোনো উত্তেজিত জনতার নয়। অভিযোগের সত্যতা যা-ই হোক, কাউকে পিটিয়ে হত্যা করার কোনো বৈধতা তৈরি হয় না। ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধা পরস্পরের বিরোধী নয়। ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির জীবন কেড়ে নেওয়া ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও আইনের শাসন — সবকিছুকেই অস্বীকার করে। ধর্মীয় পরিচয় কিংবা বিশ্বাসের দাবি কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পারে না।
সংবাদমাধ্যমে নিহত শামীমের পরিবারের নিরাপত্তাহীনতার কথাও উঠে এসেছে। একজন মানুষকে হারানোর শোকের পাশাপাশি পরিবারটিকে যদি ভয়ভীতি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়, তবে ন্যায়বিচারের পথ আরও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই পরিবারের সদস্য ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, তাঁদের ভয়ভীতি প্রদর্শন প্রতিরোধ করতে হবে এবং স্বাধীনভাবে অভিযোগ জানানোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
মামলায় বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। কিন্তু মামলায় আসামির সংখ্যা বাড়লেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না। প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট এবং অন্যান্য আইনসম্মতভাবে সংগৃহীত প্রমাণ বিশ্লেষণ করে প্রত্যেকের ভূমিকা শনাক্ত করতে হবে। যারা সরাসরি হামলা ও হত্যায় অংশ নিয়েছে, যারা সহযোগিতা করেছে কিংবা উসকানি দিয়েছে — প্রত্যেককে প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
এখন দরকার দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার। শামীম হত্যার বিচার যেন শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি না হয়; এটি যেন হয়ে ওঠে মবের কাছে রাষ্ট্রের হার না মানার ঘোষণা।


