পশ্চিম তীরে ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলা, ফরাসি মেয়র আহত অবস্থায় মাটিতে—নতুন ভিডিওতে মুহূর্ত ধরা পড়ল
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইউরোপীয় কূটনীতিক, ফরাসি ধর্মযাজক ও সফররত এক মেয়রের প্রতিনিধিদলের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার নতুন ভিডিও সামনে এসেছে। হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় প্রতিনিধিদলের বর্ণনা নিয়ে সন্দেহ তোলার চেষ্টা করে, জবাবদিহি নিশ্চিত করার কোনো প্রতিশ্রুতি না দিয়ে।
নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টের শিরোনাম ছিল বড় হাতের অক্ষরে—‘গুরুতর অভিযোগের জন্য গুরুতর প্রমাণ দরকার’। খবরটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়লেও দায়ীদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনার অঙ্গীকার সেখানে ছিল না।
পরিবর্তে নেতানিয়াহুর টিম উত্তর ফ্রান্সের অলনয়-এমেরির মেয়র বের্নার বোদুর ব্যথা ও আতঙ্কে মাটিতে পড়ে থাকার ভিডিও, একটি কূটনৈতিক গাড়ির ভাঙা জানালার ছবি এবং লাঠি হাতে কূটনীতিক ও কর্মীদের হুমকি দেওয়া মুখোশধারীদের ফুটেজকে খারিজ করে দেয়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘শুধু এসব ছবি দিয়ে ঘটনার সম্পূর্ণ ধারাবাহিকতা বা ব্যক্তিগত দায় প্রতিষ্ঠিত হয় না’, এবং ‘ইসরায়েলকে কলঙ্কিত করার সমন্বিত প্রচারণা’ নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জেরুজালেমে থাকা জ্যেষ্ঠ ফরাসি, বেলজীয় ও পোলিশ কূটনীতিক এবং হামলার সাক্ষী ক্যাথলিক চার্চের যাজকদের সততা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। বিবৃতিতে জনসাধারণ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকদের যাচাইযোগ্য প্রমাণ দাবি করা, শোনা কথা প্রত্যাখ্যান করা এবং অপ্রমাণিত অভিযোগকে অধিকৃত পশ্চিম তীরের ইহুদি বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে সমষ্টিগত অভিযোগে পরিণত না করার আহ্বান জানানো হয়।
ঘটনার দিন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে উপস্থিত থাকা এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি শহর তাইবেহতে প্রতিনিধিদলটি ফিলিস্তিনিদের জলপাই বাগানে মালিকদের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে জলপাই সংগ্রহ করে সকাল কাটানোর পর হামলাটি ঘটে। দুপুর একটার কিছু পর তাদের সতর্ক করা হয়, কাছেই জলপাই সংগ্রহরত ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীরা হামলা করেছে। সংঘাত এড়াতে দলটি এলাকা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং গাড়ির দিকে এগোনোর সময় মুখোশধারী, লাঠি হাতে হুমকি দেওয়া হামলাকারীরা কাছাকাছি চলে আসে।
হামলার আগের মুহূর্তের ফুটেজে দেখা যায়, বোদু তাঁর স্ত্রী এবং ক্যামব্রাইয়ের আর্চবিশপ ভিনসেন্ট ডলম্যানের সঙ্গে, কূটনৈতিক নিরাপত্তার প্রহরায় একটি এসইউভির দিকে এগোচ্ছেন। কিছুক্ষণ পরই বসতি স্থাপনকারীরা হামলা চালায়—প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা শুধু বিদেশিদের তাড়িয়ে দিতে চায়নি, ফিলিস্তিনিদের জমিতে তাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার ‘মূল্য’ আদায় করতেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিল।
গাড়িগুলোতে কূটনৈতিক নম্বরপ্লেট থাকায় দলটিতে বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিরা আছেন, তা স্পষ্ট ছিল। আর বোদুকে তাঁর জাতীয়তার কারণেই নিশানা করা হয়েছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কারণ তিনি মেয়রের দাপ্তরিক স্যাশ পরে ছিলেন। এক হামলাকারী আক্রমণাত্মকভাবে ‘ফ্রান্স, ফ্রান্স’ বলে চিৎকার করে তাঁকে মাটিতে ঠেলে ফেলে দেয় বলে তাঁরা বলেন।
ভিডিওর মেটাডেটা অনুযায়ী, বোদুর হামলাকারীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার শেষ দৃশ্য এবং দ্বিতীয় গাড়িতে থাকা কর্মীদের তোলা তাঁর মাটিতে পড়ে থাকার ফুটেজের মধ্যে সময়ের ব্যবধান মাত্র ২২ সেকেন্ড। এরপর দূতাবাসের নিরাপত্তা দল তাঁকে গাড়িতে তুলতে সাহায্য করে, কিন্তু গাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময়ও হামলা চলতে থাকে। উল্টো দিকের পাহাড় থেকে তোলা ফুটেজে এসইউভিটি সরে যাওয়ার সময় বসতি স্থাপনকারীদের সেটিতে আঘাত করতে দেখা যায়।
তাদের আঘাতের জোরে গাড়ির পেছনের একটি শক্তিশালী জানালা ভেঙে যায়—প্রথম ভিডিওতে সেটি অক্ষত দেখা গিয়েছিল। কয়েক মিনিট পর তাইবেহর তুলনামূলক নিরাপদ স্থানে তোলা গুঁড়িয়ে যাওয়া কাচের ছবিতে আঘাতের তীব্রতা বোঝা যায়। যাত্রীদের পাশের কোনো জানালা ভেঙে গেলে ভেতরে থাকা ব্যক্তিরা আঘাত এড়াতে পারতেন না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার বিবরণ অস্পষ্ট করা এবং বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি বা সাক্ষীদের বক্তব্য দুর্বল করার চেষ্টা ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ বারবার করেছে। তবে ইউরোপীয় মিত্রদের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকদের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী নিজে একই কৌশল প্রয়োগ করাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী চরমপন্থার নতুন আলিঙ্গন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এর আগের দিন আরেকটি গ্রামে ফিলিস্তিনিদের জলপাই সংগ্রহে বাধা দেওয়া ইসরায়েলি হামলাকারীদের নির্মম হামলায় মার্কিন সাংবাদিক হাইডি লেভিনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নেতানিয়াহুর কার্যালয় সেটিকে ‘কথিত হামলা’ ও ‘বিতর্কিত ঘটনা’ বলে বর্ণনা করে এবং বলে, তথ্য এখনো অস্পষ্ট ও তদন্তাধীন।
শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে পাওয়া এই বার্তা—রাষ্ট্র ওই হামলার জন্য পরিণতি আরোপ বা ন্যায়বিচার চাইতে অনিচ্ছুক—শনিবারের হামলাকারীদের সাহস জুগিয়ে থাকতে পারে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়।
তবে জেরুজালেমে একটি নজিরবিহীন প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। রোববার ইসরায়েলের এক ডজনের বেশি শীর্ষ সাবেক কূটনীতিক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাইরে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ করেন, যেখানে তাঁরা সবাই কয়েক দশক ধরে কাজ করেছেন। দুজন সাবেক মহাপরিচালক, একজন উপমহাপরিচালক ও অনেক রাষ্ট্রদূত অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলিদের সন্ত্রাসী প্রচারণার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে ব্যানার তুলে ধরেন। একটি ব্যানারে লেখা ছিল, নেতানিয়াহু ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সা’রের উদ্দেশে—‘ইহুদি সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করুন, এটা আপনাদের হাতে।’





