দেয়ালে লিখে গেলেন ‘আমি অভাগী মা’—চিরিরবন্দরে দুই সন্তানসহ নারীর মরদেহ উদ্ধার
দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে একটি ঘর থেকে মা ও তাঁর দুই শিশুসন্তানের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। রবিবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে উপজেলার অমরপুর ইউনিয়নের মোস্তফাপুর বালুপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ঘরের দেয়ালে লেখা কয়েকটি বাক্য ঘিরে এলাকাজুড়ে নেমে এসেছে শোক আর স্তব্ধতা।
মরদেহ উদ্ধার হওয়া নারীর নাম স্বর্ণা আক্তার (২৪)। তিনি ওই গ্রামের মাহাতাব হোসেনের ছেলে শাকিল হোসেনের (২৮) স্ত্রী। তাঁদের দুই সন্তান সাফায়েত হোসেন (৪) ও রাইফা মনি (১)। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যার পর ওই নারী নিজে আত্মহত্যা করেছেন। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শাকিল হোসেন পেশায় ইজিবাইকচালক। তিনি বেশ কিছুদিন ধরে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন বলে স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়াবিবাদ হতো। রবিবার সকালেও তাঁদের মধ্যে ঝগড়া হয়; একপর্যায়ে শাকিল বাড়ি থেকে বের হয়ে বাজারে চলে যান।
সন্ধ্যার দিকে দুই সন্তানকে নিয়ে শোবার কক্ষের দরজা বন্ধ করে দেন স্বর্ণা। দীর্ঘ সময় কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে শাকিলের মা দরজায় গিয়ে ডাকাডাকি করেন। ভেতর থেকে সাড়া না পেয়ে তিনি প্রতিবেশীদের খবর দেন। পরে প্রতিবেশীদের কয়েকজন কক্ষের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে স্বর্ণা ও তাঁর দুই সন্তানকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান।
ঘরের দেয়ালে লেখা কিছু কথা পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নূর আমিন শাহ। সেখানে লেখা ছিল, ‘আজ থেকে এই গল্প শেষ। আমার সন্তানদের পুলিশের কাছে দিয়েন না। আমি অভাগী মা। (আমার সন্তানদের) নিজে মারছি। মা-বাবা সরি। আমি তোমাদের ভালোবাসি।’
নূর আমিন শাহ বলেন, শাকিল তাঁর প্রতিবেশী। পারিবারিক কলহের জেরে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে তিনি ধারণা করছেন। এলাকার মানুষের কাছেও ঘটনাটি এসেছে বড় ধাক্কা হয়ে—একসঙ্গে তিনটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার খবরে স্তব্ধ পুরো গ্রাম।
চিরিরবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদুন নবী বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক অশান্তির জেরে ওই নারী দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যার পর নিজে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন।
ওসি আরও জানান, এ ঘটনায় স্বামী শাকিল হোসেনকে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
মরদেহগুলোর ময়নাতদন্তের পরই মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্তভাবে জানা যাবে বলে পুলিশ জানিয়েছে। দেয়ালের লেখাটিসহ ঘটনার আশপাশের সব তথ্য যাচাই করে দেখছেন তদন্তকারীরা।
ঘটনাটি আবারও সামনে এনেছে পারিবারিক অশান্তি আর মাদকাসক্তির ধ্বংসাত্মক পরিণতির প্রশ্ন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদকাসক্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের কলহই ছিল এই পরিবারের অশান্তির মূলে—যদিও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
পুলিশ বলছে, জিজ্ঞাসাবাদ ও ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে এলে ঘটনার পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হবে। তত দিন পর্যন্ত মোস্তফাপুর বালুপাড়া গ্রামে শোকের ছায়া—একটি ঘরে নিভে গেছে একটি পুরো পরিবারের প্রাণ।






