মাদক নির্মূলের দায়িত্ব যাঁদের হাতে, তাঁদেরই একাংশ জড়াচ্ছে কারবারে — নিয়ন্ত্রণ করবে কে?
যাঁদের হাতে মাদক নির্মূলের দায়িত্ব, তাঁদেরই কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ছেন মাদক সেবন, পাচার ও কারবারে। মাদক মামলার আলামত সংরক্ষণ ও ধ্বংসের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হচ্ছেন ইয়াবাসহ; অভিযোগ উঠছে থানায় কর্মরত সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই), কনস্টেবলসহ বিভিন্ন পদমর্যাদার সদস্যের বিরুদ্ধে। এমনকি ডোপ টেস্টে মাদকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ায় সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন পুলিশ সুপার পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাও। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন — মাদক দমনের দায়িত্বে থাকা বাহিনীর সদস্যরাই কারবারে জড়ালে মাদক নিয়ন্ত্রণ হবে কীভাবে?
গত কয়েক মাসে ঢাকা, রংপুর, সাতক্ষীরা, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নাটোর, বগুড়া, বরিশাল ও কিশোরগঞ্জে এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে। কোথাও ইয়াবা পরিবহন ও বিক্রির অভিযোগে গ্রেপ্তার, কোথাও মাদক সেবনের আসরে আটক, আবার কোথাও ডোপ টেস্ট পজিটিভ হওয়ায় সাময়িক বরখাস্ত — এসব ঘটনা পুলিশের অভ্যন্তরীণ নজরদারি, কারবারিদের সঙ্গে সদস্যদের সম্ভাব্য যোগসাজশ এবং জব্দ করা মাদকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সর্বশেষ ঘটনাটি রংপুরের। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) নগরীর পায়রা চত্বর এলাকার স্কাইভিউ হোটেলের সপ্তম তলার ৭১০ নম্বর কক্ষে অভিযান চালায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। সেখান থেকে ১৯ পিস ইয়াবা ও মাদক সেবনের সরঞ্জামসহ রংপুর জেলা পুলিশের কনস্টেবল মিঠুন ইসলাম (২৯) এবং সাবেক কনস্টেবল ওমর আলীকে (৩৭) গ্রেপ্তার করা হয়।
এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা বাইপাস এলাকায় ৫৬ বোতল কোরেক্স সিরাপসহ দুই পুলিশ কনস্টেবল মোস্তাইন বিল্লাহ ও নাজমুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। একই মাসের ৬ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের রামুতে ৫৪ হাজার ইয়াবাসহ এপিবিএন সদস্য মোহাম্মদ আলী মুন্না শিকদারকে গ্রেপ্তার করে বিজিবি; তাঁর কাছ থেকে মোটরসাইকেল, দুটি আইফোন ও ৫০ হাজার ৯৯০ টাকা জব্দ করা হয়।
চট্টগ্রামেও বড় চালান ধরা পড়েছে পুলিশ সদস্যের হাতে। ৫ মে কক্সবাজার থেকে ইয়াবা নিয়ে যাওয়ার পথে খুলনা জেলা পুলিশের কনস্টেবল আশিকুল ইসলাম ৫০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন। তার চার দিন আগে ১ মে রামুতে ২০ হাজার ইয়াবাসহ ৮ এপিবিএনের কনস্টেবল সজিব ব্যাপারীকে আটক করে বিজিবি। ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় মহানগর পুলিশের বিশেষ শাখার কনস্টেবল মনিরুল ইসলামও ১০ হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন; মামলার পর তাঁকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক ঘটনাগুলোর একটি রাজধানীর সূত্রাপুরের। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৭৯০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন কনস্টেবল মো. রেজাউল করিম, যিনি ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আলামত নিষ্পত্তি ও মাদক ধ্বংসসংক্রান্ত শাখায় দায়িত্ব পালন করতেন। একটি খাবারের দোকানে ইয়াবা বিক্রির উদ্দেশ্যে অবস্থানের অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে আদালতে অভিযোগ অস্বীকার করে রেজাউল দাবি করেন, ইয়াবা তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার হয়নি — যেখানে তিনি দাঁড়িয়ে ছিলেন, সেখানেই তা পড়ে ছিল।
২৪ আগস্ট রাজধানীর দক্ষিণখানে মাদক কারবারের অভিযোগে পল্লবী থানার এএসআই মো. শফিকুল ইসলাম ও তাঁর সহযোগী ওয়াসিম গ্রেপ্তার হন। পুলিশ জানায়, প্রথমে ওয়াসিমের কাছ থেকে ৫০ পিস, পরে শফিকুলের কাছ থেকে ২০০ পিস এবং আরেকটি ফ্ল্যাট থেকে ৫ হাজার ১১০ পিস ইয়াবা উদ্ধার হয়; মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা হয়েছে। শফিকুলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগও ছিল — জুনেই তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছিল বলে পল্লবী থানার তৎকালীন ওসি জানান। এরপরও তাঁর ওপর কার্যকর নজরদারি কতটা ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্য জেলাগুলোতেও একই চিত্র। ২৩ সেপ্টেম্বর নাটোরের লালপুরে ১০৬ পিস ইয়াবাসহ রাজশাহী রেঞ্জের রিজার্ভ ফোর্সের কনস্টেবল আল আমিনসহ তিনজন গ্রেপ্তার হন; জব্দ হয় দুটি মোটরসাইকেল ও নগদ ৩২ হাজার টাকা। ২৩ মে বগুড়ার তিনমাথা রেলগেট এলাকায় ক্রেতা সেজে অভিযান চালিয়ে ৩০০ পিস ইয়াবাসহ সাইদুর রহমান ও আব্দুল ওয়াহাবকে আটক করে ডিবি — সাইদুর জয়পুরহাট জেলা পুলিশের সদস্য হলেও প্রায় দুই মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন, আর ওয়াহাব চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্য।
৮ অক্টোবর বরিশালের দক্ষিণ কড়াপুর এলাকায় মাদক সেবনের আসরে অভিযান চালিয়ে বিমানবন্দর থানার এএসআই দেলোয়ার হোসেনসহ চারজনকে আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ঘটনাস্থলে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম মিললেও মাদক পাওয়া যায়নি; অভিযানের সময় দেলোয়ার পালানোর চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ওই অভিযানে আটক অন্য দুজনের ডোপ টেস্ট পজিটিভ হওয়ায় ২০ দিনের কারাদণ্ড হলেও দেলোয়ারের ডোপ টেস্ট হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয় — ফলে সাধারণ নাগরিক ও পুলিশ সদস্যের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার সমান প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ডোপ টেস্টের পরিসংখ্যানও পুলিশের অভ্যন্তরে মাদক সম্পৃক্ততার বড় চিত্র দেখায়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১০ মার্চ থেকে ২০২৩ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত ১২৬ জন সদস্যের ডোপ টেস্ট পজিটিভ হয়, তাঁদের মধ্যে ১১৬ জন চাকরিচ্যুত হন। শনাক্তদের মধ্যে ছিলেন ৯৮ জন কনস্টেবল, ১১ জন এসআই, সাতজন এএসআই, আটজন নায়েক, একজন পরিদর্শক ও একজন ট্রাফিক সার্জেন্ট। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ জানান, ২০২৫ সাল থেকে ওই সময় পর্যন্ত আরও ১৭ সদস্যের ডোপ টেস্ট পজিটিভ হয়েছে — তাঁদের মধ্যে ১৫ জন কনস্টেবল, একজন এএসআই ও একজন নায়েক; তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পদমর্যাদার দিক থেকে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা পুলিশ সুপার আ ফ ম নিজাম উদ্দিনের। সেপ্টেম্বর মাসে ডোপ টেস্ট পজিটিভ হওয়ায় তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়; প্রজ্ঞাপনে তাঁর নমুনায় বেনজোডায়াজেপিনস ও অ্যামফিটামিন বা মেথঅ্যামফিটামিন শ্রেণির উপাদান শনাক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। সর্বশেষ ১৩ অক্টোবর কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশের চালক কনস্টেবল ওসমান গনির ডোপ টেস্ট পজিটিভ হওয়ায় তাঁকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়; সেখানকার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন এবং মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা জানিয়েছেন।
পুলিশের কিছু সদস্যের মাদক সম্পৃক্ততার বিষয়টি স্বীকার করেছেন অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, পুলিশের কিছু বিপথগামী সদস্যের সম্পৃক্ততা থাকে এবং নিজেদের লোকজনের সম্পৃক্ততা না থাকলে মাদক কারবারিরা এতটা সুযোগ পেত না; তবে সবাই এমন নয়, কেউ কেউ জড়িয়ে পড়ে। মাদকের বিষয়ে বাহিনীর অবস্থান জিরো টলারেন্স উল্লেখ করে তিনি বলেন, তদন্তে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ডোপ টেস্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চাইলেই যেকোনো সময় যেকোনো সদস্যের পরীক্ষা করানো যায় না — কাউকে দৃশ্যত মাদকাসক্ত অবস্থায় না দেখলে পরীক্ষা করা কঠিন, এটি ব্যয়বহুলও এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আদালতে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. রাজিউর রহমান ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার সদস্যের বিশাল পুলিশ বাহিনীতে কিছু বিপথগামী ব্যক্তি থাকতেই পারেন, সবাই মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন; তবে অপরাধ করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। ডোপ টেস্টের পরিধি আগামী এক-দুই বছরে আরও বাড়বে বলেও তিনি জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম বলেন, মাদক এখন সামাজিক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে এবং লাখ লাখ টাকার ব্যবসাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে জড়াচ্ছেন। প্রথমেই সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে; কিন্তু যাঁরা প্রতিরোধের সামনের সারিতে, তাঁরাই জড়িয়ে পড়লে সরকারের উদ্যোগ প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাঁর মতে, দায়িত্বপ্রাপ্তদের নজরদারি ও প্রয়োজনে নিয়মিত ডোপ টেস্ট, স্বচ্ছ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া কার্যকর ও টেকসই প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন। অপরাধ বিশ্লেষকদের অভিন্ন মত — শুধু গ্রেপ্তার বা চাকরিচ্যুতি নয়, অপরাধচক্রের নেপথ্যের যোগাযোগ শনাক্ত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।






