প্যারিসের রাস্তায় পোড়া গাড়ি আর ভাঙা কাচ, বিক্ষোভের পরদিন ক্ষতচিহ্ন
ফ্রান্স রোববার সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেছে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। প্যারিসের ফুটপাতে ছড়িয়ে ছিল দোকানের ভাঙা কাচ, পোড়া গাড়ি, পোড়া বাইক এবং কাচ ও ধ্বংসাবশেষের স্তূপ। আগের দিনের দাঙ্গা ও বিক্ষোভের পর রাজধানীজুড়ে এই ক্ষতচিহ্ন ছড়িয়ে পড়েছে।
পুলিশ শনিবার প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। সেদিন প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমেছিলেন, যাদের বিক্ষোভ ছিল মূলত শান্তিপূর্ণ। তারা জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং স্কুলসহ জনসেবার অবনতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিলেন।
তবে দাঙ্গাকারীদের দল, যাদের কেউ কেউ কালো পোশাক ও মুখোশ পরে ছিল, প্যারিস, মার্সেই ও অন্যান্য শহরে বেরিয়ে আসে। তারা গাড়ি ও ভবনে আগুন দেয়।
প্যারিস, মার্সেই ও লিলসহ বিভিন্ন শহরে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের সংঘর্ষ হয়, পুলিশ ভিড়ের ওপর কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। দিনের বেলায় কিছু দল রাস্তায় আগুন জ্বালায় ও যানবাহন পোড়ায়। রাজধানীতে অন্তত একটি রেস্তোরাঁ আগুনে ধ্বংস হয়ে যায় এবং কিছু দলের মধ্যে মারামারিও দেখা যায়।
দাঙ্গা পুলিশকে মধ্য প্যারিসে একটি ভিড়ের দিকে ধেয়ে গিয়ে কয়েকজনকে লাঠি দিয়ে আঘাত করতে দেখা গেছে। আরও দক্ষিণে মার্সেইতে বিক্ষোভকারীরা একটি ধাতব বেড়াকে আঘাত করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে নগর ভবনে ঢুকে পড়ে। লিলে একটি ম্যাকডোনাল্ডসে আগুন দেওয়া হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে এবং শহরের একটি অ্যাপল স্টোর ভেঙে লুট করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু বলেছেন, অশান্তিতে ১৫০ জন পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন।
রোববার সকালে প্যারিসে বাসিন্দারা ক্ষয়ক্ষতি জরিপ করেছেন। এর মধ্যে রালফ লরেন, গুচ্চি ও ভারসাচেসহ ডিজাইনার দোকানগুলোর ভাঙা কাচের সম্মুখভাগও ছিল। দোকানদাররা ভোর থেকেই ঝাড়ু হাতে বেরিয়ে বড় কাচের টুকরো পরিষ্কার করতে শুরু করেন। আবর্জনার ট্রাক বড় রাস্তাগুলো ধরে ধ্বংসাবশেষ সরাতে কাজ করে।
অনেক দোকানে গ্রাফিতি আঁকা ছিল, যার কয়েকটিতে লেখা ছিল ধনীদের কর দাও এবং ধনীদের খাও জাতীয় স্লোগান।
প্লেস দে লা রেপুব্লিকের কাছাকাছি একটি পোশাকের দোকান লুট করা হয়, দোকানের মেঝেজুড়ে পোশাক ও আসবাব ছড়িয়ে ছিল। দোকানের মর্মাহত মালিক জানিয়েছেন, তিনি সিসিটিভিতে দেখেছেন লুটকারীরা দোকানে মাত্র দেড় ঘণ্টার বেশি সময় ছিল এবং সেই সময়ে তিনি কোনো পুলিশ দেখেননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেছেন, যারা দোকান লুট করেছে তারা স্কুলের অবস্থা বা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে প্রকৃত বিক্ষোভকারী বলে তিনি বিশ্বাস করেন না, তারা বিক্ষোভের সুযোগ নিয়েছে। ফ্রান্সের চ্যানেল ২-এ দেখানো সিসিটিভি ফুটেজে মুখোশ পরা কিশোরদের দলকে একটি মোবাইল ফোনের দোকানে তাক থেকে জিনিস তুলে নিতে দেখা গেছে।
ফ্রান্সে ছাত্র বিক্ষোভ গত মাসের শেষের দিক থেকে শুরু হয়ে কয়েক লাখ মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছে। বিক্ষোভকারীরা তাদের স্কুলে অতিরিক্ত বিনিয়োগ দাবি করছেন, শিক্ষক ও কর্মীর অভাব, উপচে পড়া শ্রেণিকক্ষ এবং জরাজীর্ণ ভবনের সমালোচনা করছেন।
লিয়ঁ শহরে মেয়র গ্রেগরি দুসে শহরের পর্যটন কার্যালয় পোড়ানোকে একটি ট্র্যাজেডি বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, এটি একটি অত্যন্ত প্রতীকী ও সুপরিচিত ঐতিহাসিক ভবন হওয়ায় ঘটনাটি হৃদয় ভেঙে দেয়। স্থানীয় পুলিশ বলেছে, প্রতিকূল ব্যক্তিরা অগ্নিনির্বাপকদের নিরাপদে আগুন নেভানোর কাজে বাধা দিয়েছে।
দমকলকর্মীরা লিমোজ নগর ভবনের আগুনের সঙ্গেও লড়াই করেছেন, যাতে ভবনটির একটি অংশ ধসে পড়ে। স্থানীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, নগর ভবনটি মূলত হারিয়ে গেছে। ওত-ভিয়েন বিভাগের প্রিফেক্ট মরিস বারাতে বলেছেন, ১৪৩ বছরের পুরোনো ভবনটিতে ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্বের শহর সাঁ-এতিয়েনে এক তরুণের হাত একটি ছোট বিস্ফোরকে উড়ে গেছে বলে মেয়র রেজিস জুয়ানিকো সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন, এমন ট্র্যাজেডি কখনো ঘটা উচিত ছিল না বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, শনিবারের বিক্ষোভে রাজধানীর বিভিন্ন অংশসহ মার্সেই, রেন, তুলুজ এবং পশ্চিমের শহর অঁজেতেও মুখ ঢাকা ব্যক্তিদের লক্ষ্যভিত্তিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গ্রেনোবল, আভিনিয়ঁ, পো, মঁপেলিয়ে ও ভালঁসসহ বিভিন্ন জায়গায় ভবনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব চলার মধ্যেই ফ্রান্সে বিক্ষোভের কারণ ও সহিংসতায় জড়িতদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক চলছে।


