দুই মাসে মাদকের অভিযোগে ২৭ পুলিশ সদস্য কারাগারে: ‘আগে নিজেদের ঘর পরিষ্কার করতে হবে’ বললেন আইজিপি
পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের মাদক-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গত দুই মাসে ২৭ জন কর্মকর্তা ও সদস্যকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেছেন, পুলিশকে শক্তিশালী করতে হলে আগে নিজেদের ঘর পরিষ্কার করতে হবে। বাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর অবস্থানের এই বার্তাই এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
রোববার সকালে বাগেরহাট জেলা পুলিশ লাইন্স মিলনায়তনে কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশ ও সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন আইজিপি। বাগেরহাট সফরে গিয়ে তিনি বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, জনবল, যানবাহন সংকট এবং অপরাধ দমনে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য দেন।
আইজিপি বলেন, বাহিনীকে দুর্বল করার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে পুলিশ সদস্যদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। অর্থাৎ মাদকবিরোধী অভিযান শুধু বাইরের অপরাধীদের জন্য নয়, বাহিনীর ভেতরে অভিযুক্তদের ক্ষেত্রেও একই কঠোরতায় প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
দুই মাসে ২৭ জন সদস্যের কারাগারে যাওয়ার এই তথ্য সেই কঠোর অবস্থানেরই সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে সামনে এসেছে। পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা নিজে প্রকাশ্যে এই সংখ্যা জানানোয় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পেয়েছে।
যানবাহন সংকট প্রসঙ্গে আইজিপি বলেন, পুলিশের যানবাহনের সংকট দূর করতে ৫ হাজার ৮০০টি গাড়ি কেনার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছে বলেও তিনি জানান।
জনবলের ঘাটতি পূরণের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি। আইজিপি বলেন, প্রতিবছর ন্যূনতম ১৫ হাজার নতুন সদস্য নিয়োগ দেওয়া হবে। এই দুই উদ্যোগ—গাড়ি কেনা ও বড় আকারের নিয়োগ—বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর মূল পরিকল্পনা হিসেবে তার বক্তব্যে উঠে এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে মাদক, কিশোর গ্যাং, দুর্নীতি ও অন্যান্য অপরাধ প্রতিরোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান আইজিপি। তিনি বলেন, অপরাধ দমনে কমিউনিটি পুলিশিং আরও কার্যকর করা হবে।
কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। এই কার্যক্রম ইউনিয়ন পর্যায়েও বিস্তৃত করা হবে।
স্থানীয় মানুষের কাছে অপরাধের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে উল্লেখ করে তিনি পুলিশকে সহযোগিতা করতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির বিষয়ে সতর্ক থাকার কথাও বলেন।
আইজিপি আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন জরুরি। বেকারত্ব মোকাবিলা, তরুণদের পুনর্বাসন এবং মাদক প্রতিরোধে সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন। সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতায় একটি মানবিক ও জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. জামিলুর ইসলাম। উপস্থিত ছিলেন খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল করিম, জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন, সরকারি পিসি কলেজের অধ্যক্ষ পারভীন আক্তার, বাগেরহাট প্রেসক্লাবের সভাপতি আবু সাইদ শুনুসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
সব মিলিয়ে আইজিপির বক্তব্যের মূল সুর ছিল একটাই: বাহিনীর ভেতরের অপরাধ ও অনিয়মে ছাড় নয়, আর বাইরের অপরাধ দমনে জনগণের সম্পৃক্ততা। দুই মাসে ২৭ সদস্যের কারাগারে যাওয়ার ঘটনা সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগ হিসেবে তিনি তুলে ধরেছেন। আগামী দিনে এই জবাবদিহি কতটা ধারাবাহিক থাকে, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।






