‘সবচেয়ে কঠিন শৈশবের শহর’ তকমা মানতে নারাজ মিডলসব্রো: মেয়র থেকে শিক্ষক—সবার এক কথা, আমাদের শিশুরা আনন্দেই আছে
ইংল্যান্ডে বড় হওয়ার জন্য সবচেয়ে কঠিন জায়গা হিসেবে মিডলসব্রো শহরের নাম উঠে এসেছে শিশু কমিশনারের এক প্রতিবেদনে। কিন্তু সেই তকমা মেনে নিতে রাজি নন শহরটির বাসিন্দারা। মেয়র থেকে শুরু করে যুবকর্মী ও শিক্ষক—অনেকেই বলছেন, এমন র্যাঙ্কিং হতাশাজনক, মনোবল ভেঙে দেয় এবং বাস্তবের পুরো চিত্রটি তুলে ধরে না।
শিশু কমিশনার র্যাচেল ডি সুজা এই সপ্তাহে প্রকাশিত ‘দ্য চাইল্ডহুড লটারি’ শিরোনামের প্রতিবেদনে শৈশবকে ‘জরুরি অবস্থার’ মধ্যে রয়েছে বলে বর্ণনা করেছেন। প্রতিবেদনটির জন্য শিশুদের জীবনের ১৬২টি সূচক একসঙ্গে করে একটি বৃহৎ তথ্যভান্ডার তৈরি করা হয়েছে—শিশু দারিদ্র্য থেকে শুরু করে স্কুল থেকে বহিষ্কারের হার, খারাপ বায়ুর মান পর্যন্ত সবকিছুই এতে ছিল। সেই তালিকার একেবারে নিচে এসেছে মিডলসব্রোর নাম।
প্রতিবেদনের পর গার্ডিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছেন শহরটির শিশু ও তরুণদের নিয়ে কাজ করা মানুষেরা। একজন যুবকর্মীর প্রতিক্রিয়া ছিল স্পষ্ট: এটা হতাশাজনক, আবারও একটা আঘাত। একজন শিক্ষক বলেন, এমন তকমা থেকে মনে হয় আমাদের শিশুরা যেন অসুখী জীবন কাটাচ্ছে—অথচ তিনি নিজের শিক্ষার্থীদের আনন্দে ভরপুর বলেই বর্ণনা করেছেন।
মিডলসব্রোর মেয়র ক্রিস কুকের ক্ষোভও লুকানো ছিল না। তার ভাষ্য, বাইরের মানুষ এসে বারবার বলে দেয় আমরা কী—কিন্তু আমরা নিজেরাই জানি আমরা কী। এর আরেকটা দিকও আছে। কুক নিজে বড় হয়েছেন একটি সহিংস পরিবারে; কিশোর বয়সে তার বাবা নিজের জীবন শেষ করেন, মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। কিছু সময় স্কুলে না গিয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে থাকতে হয়েছে পালক যত্নে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বলছেন, তার কঠিন সময়ে কেউ যদি এসে বলত তার জীবন কঠিন কিংবা আরও কঠিন হবে—তাতে কোনো উপকার হতো না।
শহরের কুলবি নিউহ্যাম এলাকার একটি ব্যস্ত যুব ক্লাবে গিয়ে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সেখানে ১০ বছর ও তার বেশি বয়সী শিশুরা হ্যালোইনের সাজসজ্জা বানাচ্ছিল, রান্না করছিল, টেবিল টেনিস খেলছিল, বাইরে ডজবল খেলার প্রস্তুতিও চলছিল। ১৫ বছর বয়সী হান্না বলেছে, তার জীবন ভালো—সে মিডলসব্রোতে থাকতে ভালোবাসে, আলবার্ট পার্ক ও ডরম্যান জাদুঘর তার প্রিয়, ফুটবল দেখতে যাওয়া আর যুব ক্লাবে এসে বন্ধু বানানো তার আনন্দের অংশ। মিডলসব্রোতে শিশু হিসেবে থাকা কঠিন কি না জানতে চাইলে এক ছেলে বিস্মিত হয়ে বলেছে, সে সারা জীবন এখানেই থাকবে—কেনই বা চলে যাবে?
ক্লাবটি পরিচালনাকারী লিনক্স ইয়ুথ প্রজেক্টের প্রধান নির্বাহী ও সাবেক সৈনিক ওয়েইন ম্যাসন বলেন, প্রতিবেদনটি মিডলসব্রো ও এর তরুণদের গায়ে আরও একটি তকমা সেঁটে দিচ্ছে—আর তকমা তাদের এমনিতেই অনেক। প্রকল্পটির উপপ্রধান এইলিস সেক্সটন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, যারা নিজেরা পরিবার শুরু করতে চায়, তাদের কাছে এই বার্তা কেমন লাগবে—যে তাদের সন্তানের বড় হওয়াটা হবে দেশের মধ্যে ‘সবচেয়ে কঠিন’? এটা খুবই হতাশাজনক।
ম্যাসন ও সেক্সটন কেউই পরিসংখ্যান অস্বীকার করেননি। তাদের বক্তব্য, গর্বই এখানকার তরুণদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত এলাকার অনেক তরুণও শহর ছেড়ে যেতে চায় না, কারণ এটাই তাদের বাড়ি। ম্যাসনের মতে, সবাই কেবল বঞ্চনা, দারিদ্র্য ও অপরাধ নিয়েই কথা বলে—কমিউনিটি বা মানুষের পারস্পরিক বন্ধন নিয়ে কেউ কথা বলে না।
প্রতিবেদনটি এমন এক সময়ে এসেছে, যার কয়েক সপ্তাহ আগেই এ৬৬ সড়কে একটি গাড়ি—যাতে পাঁচজন তরুণ ছিল—একটি পুলিশের গাড়িকে ধাক্কা দেয়; ওই পুলিশ গাড়িতে ছিলেন দুজন কনস্টেবল। দুর্ঘটনায় দুই গাড়ির সবাই মারা যান। এরপর কিছু গণমাধ্যমের চিত্রায়ণে শহরটিকে গ্যাং-শাসিত এক অন্ধকার জায়গা হিসেবে দেখানো হয়েছিল, বাসিন্দাদের মতে বাস্তবতা তার থেকে ভিন্ন।
শহরের কেন্দ্রে রয়েছে বিশাল খোলা চত্বর এবং সমকালীন শিল্পকলা গ্যালারি মিমা, যেখানে এখন টার্নার পুরস্কারের প্রদর্শনী চলছে। নিউপোর্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে সুসজ্জিত ও নিয়মিত ব্যবহৃত একটি গ্রন্থাগার—আনন্দের জন্য পড়ার ক্ষেত্রে মিডলসব্রোর পরিসংখ্যান জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক ওপরে। প্রধান শিক্ষক প্যাট্রিসিয়া ম্যাক্সওয়েল বলেন, প্রতিবেদন তাকে নতুন কিছু জানায়নি, কিন্তু শহরের শিশুদের বড় হওয়ার ইতিবাচক দিকগুলোও তাতে নেই। উপপ্রধান স্টেসি কার্লাইল বলেন, তাদের শিশুরা প্রফুল্ল ও আনন্দে ভরা; কারও কারও বাড়িতে সমস্যা থাকতে পারে, তবে তা সমৃদ্ধ এলাকাতেও একইভাবে থাকে।
প্রেক্ষাপটের আরেকটি দিক হলো সামাজিক যত্নে ব্যয়। মিডলসব্রো ইংল্যান্ডের সেই ১৬টি কাউন্সিলের একটি, যারা মূল তহবিলের ৮০ শতাংশের বেশি সামাজিক যত্নে ব্যয় করে। মেয়র কুক যুব সেবায় ব্যয়ের প্রতি তার আগ্রহের কথা জানিয়ে এমন একটি তহবিলসহ নানা উদ্যোগের কথা বলেছেন, যাতে প্রতিটি পোস্টকোড এলাকায় যুব ক্লাব থাকে। চাকরির জন্য আবেদনের সময় নিজের এলাকার পোস্টকোড বাদ দিতে বলা হয়েছিল তাকে—তিনি বাদ দেননি, উল্টো তা বড় করে লিখেছিলেন বলে জানান।
সব মিলিয়ে, পরিসংখ্যানের তালিকায় সবার নিচে থাকা এই শহরের মানুষেরা বলছেন, সংকটের সূচকগুলো তারা অস্বীকার করেন না; কিন্তু একটি তকমা দিয়ে পুরো প্রজন্মের শৈশবকে ব্যাখ্যা করা যায় না। তাদের দাবি, মিডলসব্রোর গল্পে দারিদ্র্যের পাশাপাশি গর্ব, বন্ধন আর ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাও সমান সত্য।






