সার্বিয়ায় ভোটের লড়াইয়ে ভুচিচের মুখোমুখি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন: জরিপে হাড্ডাহাড্ডি প্রতিদ্বন্দ্বিতা
সার্বিয়ায় আজ পার্লামেন্ট নির্বাচনের ভোট গ্রহণ চলছে, যেখানে এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা জনপ্রিয়তাবাদী নেতা আলেকসান্দার ভুচিচের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দুর্নীতি ও কর্তৃত্ববাদবিরোধী আন্দোলন। জরিপগুলোতে দুই পক্ষের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলেছে, ফলে এই নির্বাচনকে বলকান দেশটির রাজনীতিতে একটি মোড় বদলের মুহূর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভুচিচ গত সেপ্টেম্বরে এই আগাম নির্বাচনের ডাক দেন। প্রধানমন্ত্রী ও পরে প্রেসিডেন্ট হিসেবে এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা এই নেতা সেপ্টেম্বরেই প্রেসিডেন্ট পদ থেকে পদত্যাগ করে আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে নেমেছেন। ক্ষমতাসীন হিসেবে তাঁর অবস্থান এখনো শক্ত বলেই মনে করা হচ্ছে।
এই নির্বাচনের পেছনের প্রেক্ষাপট প্রায় দুই বছরের শিক্ষার্থী আন্দোলন। ২০২৪ সালে নোভি সাদ শহরে একটি ট্রেন স্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর থেকেই দুর্নীতি ও ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ শুরু হয়। ওই ধসের জন্য ব্যাপকভাবে সরকারি দুর্নীতিকে দায়ী করা হয়, আর সেই ক্ষোভই ধীরে ধীরে দেশজুড়ে আন্দোলনে রূপ নেয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানী বেলগ্রেডের কেন্দ্রে শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রায় দেড় লাখ সমর্থক সমাবেশ করেন, যা নির্বাচনের আগে শক্তি প্রদর্শনের বড় নজির হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ জোটের প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন ২৫০ জন, যাঁদের বেশিরভাগই রাজনীতিতে নতুন মুখ — বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, অভিনয়শিল্পী, কৃষকসহ নানা পেশার মানুষ। এই তালিকার নেতৃত্বে রয়েছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ইলিয়া স্রদানোভিচ। তাঁদের কর্মসূচির কেন্দ্রে রয়েছে দুর্নীতি নির্মূল ও শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন; আন্তর্জাতিক নীতি নিয়ে তাঁরা তুলনামূলক কম কথা বলেছেন।
অন্যদিকে প্রচারণায় ভুচিচ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পেনশন ও সরকারি খাতের বেতন বাড়ানো, রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ এবং নবদম্পতিদের জন্য ভর্তুকি। পররাষ্ট্রনীতিতে তিনি বড় বিনিয়োগকারী চীন এবং ঐতিহ্যবাহী মিত্র ও প্রধান প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহকারী রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রেখেছেন, একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের দরজাও খোলা রেখেছেন।
তবে তাঁর শাসনামলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সার্বিয়ার সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে। বিচারব্যবস্থা, আইনের শাসন ও দুর্নীতি মোকাবিলায় সংস্কারের অভাব নিয়ে ব্লকটি ক্রমশ হতাশা প্রকাশ করে আসছে।
জনমত জরিপে লড়াই অত্যন্ত কাছাকাছি। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ইপসোসের জরিপে ভুচিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টিকে ৪৭ শতাংশ এবং শিক্ষার্থীদের ৪০ শতাংশ ভোট দেওয়া হয়েছে। তবে অন্য কয়েকটি জরিপে শিক্ষার্থীদেরই এগিয়ে থাকতে দেখা গেছে।
ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক মেপলক্রফটের জ্যেষ্ঠ ইউরোপ বিশ্লেষক মারিও বিকারস্কি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ‘সার্বিয়ার এই নির্বাচন দেশটির জন্য একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ হয়ে উঠছে, কারণ স্টুডেন্ট লিস্ট ভুচিচের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে।’
মানবাধিকার সংগঠন ও কর্মীদের অভিযোগ, স্টেশনের ছাউনি ধসের পর থেকে দমন-পীড়ন আরও বেড়েছে। ভুচিচ ও তাঁর দল অবশ্য দমন, দুর্নীতি কিংবা বিরোধীদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারির সব অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছে। সাবেক এই প্রেসিডেন্টের দাবি, শিক্ষার্থীদের ক্রোয়েশিয়া ও মন্টিনিগ্রোর বিদেশি এজেন্টরা অর্থায়ন করছে — শিক্ষার্থীরা সেই অভিযোগও অস্বীকার করেছে।
অনেক ভোটার অবশ্য ভুচিচকে কৃতিত্ব দেন সার্বিয়াকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে টেনে তোলা এবং টেকসই আধুনিকায়নের একটি পর্ব পরিচালনার জন্য। প্রায় ৬০ লাখ মানুষের এই বলকান দেশে তিনি হারলে তা হবে গভীর রাজনৈতিক পালাবদল — বিশ্লেষকদের মতে, এপ্রিলে হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবানের পরাজয়ের সঙ্গে যার মিল খুঁজে পাওয়া যাবে।
ভোট গ্রহণ শেষে ফলাফল আসতে শুরু করলেই স্পষ্ট হবে, এক দশকের বেশি সময়ের ভুচিচ যুগ আরও এগিয়ে যাবে, নাকি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনই সার্বিয়ার রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।




