চাষের মাছ ও পুকুরের পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক, খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ
প্রবহমান নদী ও সমুদ্রের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার খবর নতুন নয়, কিন্তু এবার কৃত্রিম ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চাষ করা মিঠাপানির মাছের শরীরে এবং পুকুরের তলদেশের কাদায়ও এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি মিলেছে, যা সারা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
ময়মনসিংহের ত্রিশাল অঞ্চলে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় চাষের মাছ ও পুকুরের পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। গবেষণাটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল পলিউশনে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, পুকুরের তলদেশের পলিতে প্রতি কেজিতে গড়ে ১১টির বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা জমা হয়েছে। আবদ্ধ জলাশয়ে পানির বিনিময় সীমিত থাকায় প্লাস্টিক কণাগুলো তলদেশে স্থায়ী রূপ নিচ্ছে বলেও গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
এর ফলে এই কণাগুলো সহজেই জলজ খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে। অর্থাৎ পুকুরের পলি থেকে শুরু করে মাছের শরীর হয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষের খাবারের পাতে পৌঁছে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এই ক্ষতিকর কণাগুলো পুকুরে কীভাবে ঢুকছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। গবেষকদের মতে, নিম্নমানের বাজারজাত করা মাছের ফিড, ফিডের প্লাস্টিক বস্তা ও মোড়ক, মাছ ধরার জালের অবশিষ্টাংশ, পুকুরপাড়ে গড়ে ওঠা মুরগির খামার এবং আশপাশের গৃহস্থালি প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে কণাগুলো ছড়িয়ে পড়ছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সাধারণ রান্নার তাপমাত্রায় এসব পলিথিন পলিমার ধ্বংস হয় না বলে বিশেষজ্ঞদের মতের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে মাছের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এগুলো যকৃৎ ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।
বাংলাদেশ আজ বিশ্বে চাষের মাছ উৎপাদনে অন্যতম শীর্ষস্থানে রয়েছে। কোটি কোটি মানুষের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ এবং পুষ্টির জোগান দিতে এই খাতের ভূমিকা অপরিসীম বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
কিন্তু প্লাস্টিক দূষণের এই ছোবল নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে দেশের সফল এই মৎস্য খাত যেমন ভাবমূর্তি-সংকটে পড়বে, তেমনি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষাও মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুকুরপাড়ে যত্রতত্র পোলট্রি খামার স্থাপন ও প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে মৎস্য অধিদপ্তরকে চাষের মাছের খাদ্য বা ফিডের মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর নজরদারি চালাতে হবে।
পাশাপাশি দেশের অন্যান্য মাছ চাষ অঞ্চলের পুকুর ও জলাশয়গুলোতেও বৃহৎ পরিসরে নিয়মিত পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ চালানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে, যাতে দূষণের বিস্তার সম্পর্কে আগেভাগেই ধারণা পাওয়া যায়।
পরিবেশ সুরক্ষা ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে অবিলম্বে নীতিমালা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই প্লাস্টিক দূষণ অজান্তেই এক মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে বলেও প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে।
ত্রিশালের এই গবেষণার ফল তাই শুধু একটি এলাকার সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি সারা দেশের পুকুরভিত্তিক মাছ চাষ, খাদ্য উৎপাদন এবং জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি আগাম সতর্কবার্তা হিসেবেই সামনে এসেছে।






