আমদানি করা চালে বিষাক্ত আফলাটক্সিন: প্রাথমিক পরীক্ষায় ‘খাবার উপযোগী’ বলা চালানে পরে ধরা পড়ল ছত্রাকের বিষ, প্রশ্নের মুখে খাদ্যনিরাপত্তা
আমদানি করা চালের একটি চালানে ক্ষতিকর ছত্রাকজাত বিষ আফলাটক্সিন শনাক্ত হওয়ার ঘটনা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। চট্টগ্রামের হালিশহর কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামে ভারত থেকে আমদানি করা ১৩৫ টন চালে এই উপাদান শনাক্ত হয়েছে — অথচ প্রাথমিক পরীক্ষায় চালানটিকে খাবার উপযোগী বলা হয়েছিল।
খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদা, আর সেই খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কিন্তু আমদানি করা চালের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা এবং পরীক্ষায় আফলাটক্সিনের উপস্থিতি মেলার ঘটনা সেই দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাংলাদেশ ও ভারতের বাজারের চালেও আফলাটক্সিনের উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যাটি কোনো একটি দেশ বা নির্দিষ্ট চালের চালানে সীমাবদ্ধ নয়। উৎপাদন, সংগ্রহ, পরিবহন ও সংরক্ষণের বিভিন্ন পর্যায়ে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা হলে চালসহ বিভিন্ন খাদ্যশস্যে ছত্রাক জন্মাতে পারে। এর ফলে তৈরি হতে পারে আফলাটক্সিন, যা দীর্ঘমেয়াদে লিভারের ক্ষতি ও ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও খাদ্যশস্যে ছত্রাকজাত বিষের উপস্থিতিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, পরে ধরা পড়ল বিষ — ভারত থেকে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির আওতায় আমদানি করা চালের চালানটি ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে মান যাচাইয়ের পদ্ধতি নিয়ে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২১ জুলাই ২০২৬ চালবোঝাই এমভি এইচটি পাইওনিয়ার চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায়। পরদিন নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদনে চালকে খাবার উপযোগী বলা হলে ২৪ ও ২৫ জুলাই তা খালাস করা হয়।
পরে বিভিন্ন খাদ্যগুদামে চাল পৌঁছানোর পর রং পরিবর্তন, দুর্গন্ধ ও নিম্নমানের অভিযোগ ওঠে। ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, চালের মান নিয়ে সন্দেহ দেখা দেওয়ায় প্রায় ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বিতরণ স্থগিত করা হয়েছিল। এর আগে ৯৮৪ টন নিম্নমানের চাল ফেরত পাঠানোর তথ্যও প্রকাশিত হয়। পরবর্তী পরীক্ষায় হালিশহর কেন্দ্রীয় খাদ্যগুদামের ১৩৫ টন চালে আফলাটক্সিন শনাক্ত হওয়ার তথ্য সামনে আসে।
এ ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো — প্রথম পরীক্ষায় চালকে খাবার উপযোগী ঘোষণা করার পরও পরবর্তী পরীক্ষায় ক্ষতিকর উপাদান ধরা পড়ল কেন? নমুনা সংগ্রহের পদ্ধতি, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, চালের সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং সরবরাহকারীর মান নিয়ন্ত্রণ — সবকিছুই এখন পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
শুধু বাংলাদেশ নয়, অন্য দেশেও চালের নমুনায় আফলাটক্সিন পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ভারতের হায়দরাবাদের স্থানীয় বাজার থেকে সংগৃহীত চালের নমুনা পরীক্ষা করে ৫৪ শতাংশ নমুনায় আফলাটক্সিন বি১ এবং ৩৪ শতাংশ নমুনায় বি২ শনাক্ত হওয়ার কথা জানানো হয়; তিনটি নমুনায় মোট আফলাটক্সিনের মাত্রা ভারতের নির্ধারিত গ্রহণযোগ্য সীমা ছাড়িয়েছিল। তবে গবেষণাটি হায়দরাবাদের নির্দিষ্ট নমুনার ওপর পরিচালিত — এটি ভারতের সব চালের প্রতিনিধিত্ব করে না।
বাংলাদেশি গবেষক নুরশাদ আলীর ২০১৯ সালের পর্যালোচনায় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশের বাজারের চালসহ এশিয়ার একাধিক দেশের চাল ও চালজাত পণ্যে আফলাটক্সিন শনাক্ত হওয়ার তথ্য উঠে আসে। চীন, ইরান, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের চালের নমুনাতেও বিভিন্ন সময়ে এই বিষের উপস্থিতি পাওয়া গেছে — যদিও বিভিন্ন দেশের পরীক্ষার পদ্ধতি, নমুনার ধরন ও আইনি সীমা এক নয়।
আফলাটক্সিন এক ধরনের মাইকোটক্সিন — অর্থাৎ নির্দিষ্ট ছত্রাকের তৈরি বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ। Aspergillus flavus ও Aspergillus parasiticus গোত্রের ছত্রাক থেকে এটি তৈরি হতে পারে। ধান, চাল, ভুট্টা, বাদামসহ বিভিন্ন খাদ্যশস্যে অনুকূল আর্দ্রতা ও তাপমাত্রায় এসব ছত্রাক বাড়তে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, আফলাটক্সিনের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শ লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত; বেশি মাত্রায় গ্রহণ করলে তীব্র বিষক্রিয়াও হতে পারে। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, খাদ্যে ছত্রাকের উপস্থিতি সব সময় খালি চোখে বোঝা যায় না এবং প্রচলিত রান্নার তাপে এই বিষ নির্ভরযোগ্যভাবে সম্পূর্ণ নষ্ট হয় না। তাই চালের রং, গন্ধ বা বাহ্যিক চেহারা দেখে একে সম্পূর্ণ নিরাপদ ঘোষণা করা যায় না — আবার রং বদলালেই নিশ্চিতভাবে আফলাটক্সিন আছে, এমন সিদ্ধান্তও দেওয়া যায় না; প্রয়োজন উপযুক্ত পরীক্ষাগারের বিশ্লেষণ।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নুরশাদ আলী বলেছেন, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরীক্ষার চূড়ান্ত ফল ও ঝুঁকি মূল্যায়ন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট চাল আলাদা ও নিরাপদভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। প্রয়োজনে স্বীকৃত স্বাধীন পরীক্ষাগারে নমুনা পাঠিয়ে আফলাটক্সিনের মাত্রা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বন্দরে প্রাথমিক নমুনা পরীক্ষা নয়, ঝুঁকিভিত্তিকভাবে চাল খালাস ও গুদামজাত করার পরও মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে; আমদানি করা চালের পাশাপাশি স্থানীয় মিল, পাইকারি বাজার, খুচরা দোকান ও সরকারি খাদ্যগুদামের চালও নিয়মিত নমুনা পরীক্ষার আওতায় আনতে হবে।
বাংলাদেশে চাল কোটি মানুষের প্রধান খাদ্য। আমদানি করা হোক কিংবা দেশীয় উৎপাদন — কোনো চালই যথাযথ পরীক্ষা ও মান যাচাই ছাড়া মানুষের খাদ্য হিসেবে বিতরণ করা উচিত নয়। দ্রুত ও স্বচ্ছ পরীক্ষার ফল প্রকাশ, সন্দেহজনক চালের নিরাপদ নিষ্পত্তি এবং নিয়মিত বাজার নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাও বাড়বে।





