উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে রূপপুর: পরীক্ষা শেষ, নিয়ন্ত্রণ সংস্থার অনুমোদন পেলেই শুরু পাওয়ার স্টার্টআপ, বছরের শেষে গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াটের আশা
দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর এখন উৎপাদন শুরুর দ্বারপ্রান্তে। নিয়ন্ত্রণ সংস্থার চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেই বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরুর (পাওয়ার স্টার্টআপ) লক্ষ্যে কেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট ‘সি’ পর্যায়ে প্রবেশ করবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ২৫ অক্টোবরের দিকে পাওয়ার স্টার্টআপ কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি চলছে।
প্রথম ইউনিটের বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্টসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এসব পরীক্ষার প্রতিবেদন ইতোমধ্যে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়েরা) কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন অপেক্ষা শুধু নিয়ন্ত্রণ সংস্থার চূড়ান্ত অনুমোদনের।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকীর মাহবুব আনামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে উচ্চপর্যায়ের একটি রুশ প্রতিনিধিদল। এ সময় তারা রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের প্রথম ক্রিটিক্যাল পর্যায় ও সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে মন্ত্রীকে অবহিত করে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রুশ দূতাবাসের এক বিজ্ঞপ্তি ও ফেসবুক পোস্টে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রোসাটমের প্রথম উপমহাপরিচালক ও অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্টের (এএসই) প্রেসিডেন্ট আন্দ্রেই পেত্রোভের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজের অগ্রগতি পরিদর্শনে ২০ থেকে ২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ সফর করে। এ সময় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ঢাকায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীর সঙ্গে রুশ রাষ্ট্রীয় করপোরেশনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। এতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এবং বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি কমিশন ও অপারেটিং সংস্থা এনপিসিবিএলের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন। বৈঠকে উভয় পক্ষ বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ ও প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করে এবং অদূর ভবিষ্যতে যৌথভাবে করণীয় পদক্ষেপ নির্ধারণ করে।
নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মো. জাহেদুল হাসান বলেন, বি-২ ধাপের সব পরীক্ষা ও কার্যক্রম সফলভাবে শেষ হয়েছে। ইউনিট-১-এর বি-২ ধাপের ফিজিক্স টেস্টও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার পরীক্ষার প্রতিবেদন বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বৈঠকে উচ্চপর্যায়ের রুশ প্রতিনিধিদল ইউনিট-১-এর ক্রিটিক্যাল পর্যায়ের অগ্রগতি সম্পর্কে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছে। নিয়ন্ত্রণ সংস্থার অনুমোদন পেলেই ‘সি’ স্টেজে প্রবেশ করে পাওয়ার স্টার্টআপের দিকে যাওয়া হবে।
জাহেদুল হাসান জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে সীমিত পরিসরে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। প্রক্রিয়ার সফল অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তা ধীরে ধীরে বাড়ানো হবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে পৌঁছালে তা জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চলতি মাসের শেষ দিকে ২৫ অক্টোবর রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে পাওয়ার স্টার্টআপ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এ কার্যক্রম পুরোপুরি নির্ভর করছে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার চূড়ান্ত অনুমোদনের ওপর। অনুমোদন মিললেই শুরু হবে দেশের বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়—প্রথমবারের মতো পারমাণবিক জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন।
প্রত্যাশা করা হচ্ছে, চলতি বছরের শেষ দিকে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হবে। তবে প্রতিটি ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করে পরবর্তী ধাপে উত্তরণের ওপরই বিষয়টি নির্ভর করছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপেই নিরাপত্তা যাচাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফিজিক্স টেস্টের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে নিয়ন্ত্রণ সংস্থা সন্তুষ্ট হলেই পরবর্তী ধাপের অনুমতি মিলবে। সেই কারণেই সময়সূচি নিয়ে সংশ্লিষ্টরা নির্দিষ্ট করে কিছু বলছেন না।
সবকিছু ঠিক থাকলে কয়েক দিনের মধ্যেই পাওয়ার স্টার্টআপ শুরু হয়ে যাবে রূপপুরে। তখন থেকেই ধাপে ধাপে বাড়বে উৎপাদন, আর বছরের শেষ নাগাদ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে রূপপুরের বিদ্যুৎ—দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় যা হবে একটি মাইলফলক ঘটনা। এখন সবার চোখ বায়েরার চূড়ান্ত অনুমোদনের দিকে।



