সুদানে জ্বালানির দামে নাকাল শ্রমজীবীরা: লাইনে কাটে দিন, আয়ের অর্ধেক যায় যাতায়াতেই
সুদানে জ্বালানির তীব্র সংকট আর লাফিয়ে বাড়তে থাকা দাম সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন সংকটে ফেলেছে। দেশটির লোহিত সাগর তীরের শহর পোর্ট সুদান থেকে রাজধানীর আশপাশ পর্যন্ত — পরিবহনশ্রমিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী আর ছোট ব্যবসায়ী, সবার কাছেই এখন প্রতিদিনের লড়াইটা জ্বালানি জোগাড় করা আর যাতায়াতের খরচ মেটানো নিয়ে।
ষাট বছর বয়সী আজহারি মোহামেদ পোর্ট সুদানের শাগার এলাকা থেকে শহরের কেন্দ্র পর্যন্ত দিনে সাতবার মিনিবাস চালান আটজন যাত্রী নিয়ে। ভোর ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত লম্বা সময় কাজ করলেও জ্বালানির অভাবে তাঁর আয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
আজহারির মিনিবাসে দিনে তিন গ্যালন (প্রায় ১১ লিটার) পেট্রল লাগে, যার খরচ প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার সুদানি পাউন্ড — সমান্তরাল বাজারের বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ১১ ডলার ৩০ সেন্ট। জ্বালানি পাওয়া কঠিন হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন দুই দিন রাস্তায় থাকেন আর তৃতীয় দিনটা কাটান জ্বালানির লাইনে দাঁড়িয়ে।
ট্যাংক ভরতে গিয়ে তাঁকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি লাইনে অপেক্ষা করতে হয়, আর অনেক সময় তাঁর পালা আসার আগেই পেট্রল শেষ হয়ে যায়। তখন আবার অন্য পেট্রল স্টেশনের লাইনের শেষে গিয়ে দাঁড়াতে হয় নতুন করে অপেক্ষা শুরু করতে।
দামও বেড়েছে তীব্রভাবে। খার্তুমের দক্ষিণে গাজিরা রাজ্যে এক গ্যালন পেট্রলের দাম এখন ৪০ হাজার সুদানি পাউন্ড (প্রায় ৪ ডলার ৩০ সেন্ট), আর পোর্ট সুদানে তা ৩৫ হাজার পাউন্ড (প্রায় ৩ ডলার ৮০ সেন্ট)।
আজহারি বলেন, জ্বালানির অভাবে তাঁরা আর কাজই করতে পারছেন না; পরিবহনের ভাড়া দিয়ে গাড়ি চালানোর খরচ আর সংসারের খরচ — কোনোটাই আর মেটে না। লাইনে দাঁড়িয়ে কাটানো লম্বা সময়টা তাঁর আয়ের সময়, তাই হারানো আয় পুষিয়ে নিতে রাতে বাড়তি সময় কাজ করতে হয় তাঁকে।
সব খরচ বাদ দিয়ে দিন শেষে আজহারির হাতে থাকে মাত্র ৫০ হাজার সুদানি পাউন্ড (প্রায় ৫ ডলার ৪০ সেন্ট) — যা দিয়ে স্ত্রী আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মেয়ের টিউশন ফি ও দৈনন্দিন খরচসহ পুরো পরিবার চালানো প্রায় অসম্ভব। তাঁর সোজা কথা — জ্বালানি পাওয়া গেলেই তাঁরা কাজ করতে পারবেন, এই বাধাটাই তখন আর থাকবে না।
সংকটের কারণে সুদানের পরিবহন চেম্বার্স ইউনিয়ন এই মাসেই আন্তঃনগর বাসের ভাড়া ৪০ শতাংশ আর মিনিবাসের ভাড়া ৩০ শতাংশ বাড়িয়েছে। কিন্তু ভাড়া বাড়লেও যাত্রীদের ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
পোর্ট সুদানের উম্ম আল-কুরা এলাকার বাসিন্দা আজিজা ইব্রাহিম (৩৮) চার সন্তানকে চালান পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ করে। শুধু কর্মস্থলে যাওয়াই এখন তাঁর জন্য বড় আর্থিক বোঝা; যাতায়াতের খরচ কমাতে তিনি সপ্তাহে কাজের দিন কমিয়ে তিন দিনে নামিয়ে এনেছেন।
যুদ্ধের আগে বাড়ি থেকে শহরের কেন্দ্রের প্রধান পরিবহন স্টেশন পর্যন্ত যেতে জনপ্রতি খরচ হতো ৭০০ সুদানি পাউন্ড (প্রায় ৮ সেন্ট)। এখন কোনো কোনো রুটে তা বেড়ে ২ হাজার ৫০০ পাউন্ড (প্রায় ২৭ সেন্ট) হয়েছে। আজিজা জানান, বাড়ি থেকে কর্মস্থলে যাতায়াতে তাঁর দিনে ১১ হাজার পাউন্ড (প্রায় ১ ডলার ১৮ সেন্ট) লাগে।
যাতায়াতের খরচই এখন আজিজার মাসিক ৪ লাখ পাউন্ড (প্রায় ৪৩ ডলার) বেতনের প্রায় অর্ধেক খেয়ে ফেলে; তার ওপর আছে ডায়াবেটিসের ব্যয়বহুল চিকিৎসা। কখনো কখনো কাজে যাওয়ার জন্যই তাঁকে টাকা ধার করতে হয়, যা মাসের শুরুতে বেতন পেয়ে শোধ করেন — অথচ সেই বেতন পরিবারের প্রয়োজন মেটাতেই যথেষ্ট নয়।
জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ সুদানে গড় আয়কে ১৯৯০-এর দশকের পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে। এর পেছনে আছে দেশটির তেল খাতের ওপর গৃহযুদ্ধের আঘাত। সুদানি সশস্ত্র বাহিনী (এসএএফ) ও প্রতিদ্বন্দ্বী আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে লড়াই শুরু হয় ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল।
গত বছর জ্বালানি ও পেট্রলিয়াম মন্ত্রণালয় যুদ্ধ-সংশ্লিষ্ট ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার কোটি ডলার বলে হিসাব করেছিল। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, বালিলা তেলক্ষেত্রে হামলা খার্তুম শোধনাগারে সরবরাহ ব্যাহত করেছে — যে শোধনাগার একসময় দেশের পেট্রল ও তরলীকৃত পেট্রলিয়াম গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ মেটাত।
যুদ্ধের ক্ষতিতে তেল উৎপাদন তীব্রভাবে কমে যাওয়ায় সুদান এখন আমদানির ওপর নির্ভরশীল, আর বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে গ্যাস, পেট্রল ও ডিজেলসহ সব পণ্যের দাম বেড়েছে। অর্থনীতি বিশ্লেষক সিদি ওহাজ বলেছেন, পেট্রলিয়াম আমদানিকারকদের জন্য সরকারি শর্তও সংকট বাড়িয়েছে — কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ২০০ কেজি সোনা জমা রাখা আর নিজস্ব জ্বালানি মজুত সুবিধা থাকার শর্ত পূরণ করতে না পেরে কিছু আমদানিকারক বাজার থেকে ছিটকে গেছেন, তাতে সরবরাহ আরও কমেছে।
সিদির মতে, সরবরাহ বাড়াতে সরকারের জরুরি ভিত্তিতে আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করা দরকার, কারণ এই ঘাটতি পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে ব্যাহত করতে থাকায় পরিস্থিতির শিগগির উন্নতির আশা কম বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ড্রোন হামলা সুদানজুড়ে অবকাঠামোর জন্য হুমকি হয়ে থাকায় তেল খাতের সামনে সেটাই অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
ওমদুরমান বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ী আহমেদ আল-হাজ পেট্রলিয়াম জেলিসহ ত্বকের যত্নের পণ্য নিজে প্যাকেজ করে বিক্রি করেন। তিনি বলেন, জ্বালানির বাড়তি দাম তাঁর ব্যবসার প্রায় সব ক্ষেত্রেই খরচ বাড়িয়েছে — আমদানি করা কাঁচামাল পরিবহনে এক টন পণ্যের খরচ বেড়েছে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ, আর সেই বাড়তি খরচই শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে প্রতিফলিত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় জ্বালানিচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হলে দৈনন্দিন বিলে আরও খরচ যোগ হয়। ওমদুরমানের ভেতরে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার খরচ আগে ছিল ৫ হাজার সুদানি পাউন্ড (প্রায় ৭০ সেন্ট), এখন তা ১০ থেকে ১২ হাজার পাউন্ড (১ ডলার ৭ সেন্ট থেকে ১ ডলার ২৯ সেন্ট)। অন্য রাজ্যে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানো উচ্চ পরিবহন খরচে অসম্ভব হয়ে গেছে, আর পরিবহনশ্রমিকরা সফর কমিয়ে দেওয়ায় ব্যবসায়ীদের কাছে পণ্য জমে যাচ্ছে।
সব মিলিয়ে সুদানের জ্বালানি সংকট এখন শুধু পেট্রল স্টেশনের লাইনের গল্প নয় — এটি প্রতিদিনের আয়, যাতায়াত, পণ্যের দাম আর পরিবারের খাবারের টেবিল পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া এক গভীর জীবনযাত্রার সংকট, যার শেষ কবে হবে তা যুদ্ধের গতিপথের ওপরই নির্ভর করছে।





