‘মেয়ের বিচার চাইতে গিয়েছিলাম, মব করতে নয়’: টঙ্গীর শিশু নিপীড়নের অভিযোগে বাবা রুমির সংবাদ সম্মেলন
গাজীপুরের টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার একটি আবাসিক মাদরাসায় ছয় বছর বয়সী এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এবং পরে অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধরের ঘটনা ঘিরে এবার প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমি। শনিবার দিবাগত রাত আনুমানিক তিনটার দিকে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের আনা পাল্টা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন এবং মেয়ের ওপর হওয়া নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচার চেয়ে দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন।
মাদরাসায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি বা দলবল নিয়ে চড়াও হওয়ার অভিযোগ সরাসরি খণ্ডন করেছেন রুমি। তার বক্তব্য, তিনি মব সৃষ্টি করতে যাননি; একজন বাবা হিসেবে সন্তানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতেই তিনি মাদরাসায় গিয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের ‘ফ্ল্যাট দখল করতে যাওয়া’র দাবিও তিনি অস্বীকার করেন এবং পাল্টা প্রশ্ন তোলেন — মব করতে গেলে সেখানে উপস্থিত দুই শতাধিক লোক তাকে মারল না কেন।
ভাঙচুরের অভিযোগ প্রসঙ্গে রুমি একটি ছোট কাচের গ্লাস ভাঙার কথা স্বীকার করেছেন এবং এর ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেওয়ার কথাও বলেছেন। তবে তার দাবি, শিক্ষক আসার আগেই গ্লাসটি ভেঙেছিল এবং ওই সময়ের ভিডিও রেকর্ডও রয়েছে; ইচ্ছাকৃতভাবে তিনি কিছু ভাঙতে চাননি।
মাদরাসা থেকে ১৭ লাখ টাকা চুরির যে অভিযোগ তার বিরুদ্ধে উঠেছে, সেটি সিসিটিভি ফুটেজ দিয়ে যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তিনি। রুমির বক্তব্য, প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে — তিনি কোথায় ১৭ লাখ টাকা নিয়ে গেছেন, ফুটেজ দেখেই তা প্রমাণ করা হোক। পাশাপাশি মাদরাসায় এত টাকা রাখা হয় কীভাবে, সেই প্রশ্নটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার বলে তিনি মন্তব্য করেন এবং তার বিরুদ্ধে তোলা সব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি নিজের অবস্থানও স্পষ্ট করেছেন রুমি। তিনি বলেন, তিনি মাদরাসার বিরুদ্ধে নন, শিক্ষকদের বিরুদ্ধেও নন; দ্বিনি শিক্ষার জন্যই তিনি মেয়েকে সেখানে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু যেখানে সন্তান নিরাপদ থাকবে না, সেখানে এমন ঘটনা ঘটলে একজন বাবা হিসেবে তিনি কী করবেন — সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার ভাষ্য, তিনি ইসলাম বা প্রকৃত আলেমদের বিরুদ্ধে কথা বলছেন না; যারা ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে অপরাধ করে এবং সত্য আড়ালের চেষ্টা করে, তিনি তাদের বিরুদ্ধেই কথা বলছেন।
ঘটনার পর পরিবারের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া মানসিক যন্ত্রণার কথাও তুলে ধরেন তিনি। রুমি জানান, এই ঘটনার পর তিনি এক রাতও ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি; তার দিন কীভাবে কাটছে, তা আল্লাহই ভালো জানেন। নিজের জায়গায় অন্য কেউ থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারত বলেও তিনি মন্তব্য করেন — সন্তানের সঙ্গে এমন ঘটনার কথা শোনার পর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল।
প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্তাব্যক্তির বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগও এনেছেন রুমি। তার দাবি, ঘটনার বিষয়ে তিনি তিন দিন আগেই অধ্যক্ষকে অভিযোগ জানিয়েছিলেন, কিন্তু অধ্যক্ষ বারবার বলেছেন তিনি কিছু জানেন না। অধ্যক্ষের কক্ষের বাইরে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছেন তিনি; পরে কথা বলতে গেলে এমন আচরণ করা হয়েছে, যেন অধ্যক্ষ তার সঙ্গে দেখাই করতে চান না। অভিযোগ জানানোর পরও কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেই প্রশ্নের উত্তর তিনি জানতে চেয়েছেন।
এই ঘটনা ঘিরে এখন দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও অভিযোগ সামনে এসেছে — একদিকে শিশু নিপীড়নের মূল অভিযোগ, অন্যদিকে মব, ভাঙচুর ও টাকা চুরির পাল্টা অভিযোগ। রুমি তার সংবাদ সম্মেলনে বারবার সুষ্ঠু তদন্তের কথাই বলেছেন এবং সিসিটিভি ফুটেজকে নিরপেক্ষ প্রমাণ হিসেবে সামনে আনার দাবি জানিয়েছেন।
শিশুটির বাবার এই প্রকাশ্য বক্তব্যের পর এখন নজর তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের দিকে — মূল নিপীড়নের অভিযোগের তদন্ত কোন দিকে এগোয় এবং পাল্টা অভিযোগগুলোর সত্যতা ফুটেজ ও তদন্তে কীভাবে যাচাই হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। রুমি দেশবাসীর সহযোগিতা চেয়ে বলেছেন, তিনি শুধু তার মেয়ের বিচার চান।




