পটিয়ায় নাস্তা কম দেওয়া নিয়ে বিরোধ: মারধরের ৯ দিন পর আইসিইউতে মারা গেলেন অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ
চট্টগ্রামের পটিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে নাস্তা কম দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে মারধরের শিকার হওয়ার নয় দিন পর মারা গেছেন তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ সিফাতুন নুর (২২)। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় সিফাতুনের শাশুড়িসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ করেছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। পুলিশ বলছে, অভিযোগটি তদন্ত করে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, চন্দনাইশ পৌরসভার বাসিন্দা মো. নুরের মেয়ে সিফাতুনের প্রায় পাঁচ মাস আগে পটিয়ার কুসুমপুরা ইউনিয়নের পূর্ব কুসুমপুরা গ্রামের দুবাইপ্রবাসী মো. তারেকের (২৬) সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামী প্রবাসে থাকায় তিনি শ্বশুরবাড়িতেই বসবাস করতেন।
সিফাতুনের পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই তিনি শ্বশুরবাড়িতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন। গত ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে সিফাতুনের মা জুহিনুর আক্তার (৫৫) মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে হাতে তৈরি নাস্তা নিয়ে যান। নাস্তার পরিমাণ কম হওয়াকে কেন্দ্র করে সেখানে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়।
পরিবারের দাবি অনুযায়ী, একপর্যায়ে সিফাতুনের শাশুড়ি রিজিয়া বেগম (৬০) তাঁর মাকে মারধর করেন। একই সময় রাশেদা বেগম (৫৫) ও সুমি আক্তার (৫২) সিফাতুনের চুলের মুঠি ধরে মাটিতে ফেলে মারধর করেন বলেও অভিযোগ ওঠে। তাঁদের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে মা ও মেয়েকে উদ্ধার করেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ওই রাতেই সিফাতুনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় আইসিইউতে তাঁর চিকিৎসা চলছিল। টানা নয় দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর শুক্রবার দুপুর দেড়টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় গত ১৪ অক্টোবর পটিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ করেন সিফাতুনের মা জুহিনুর আক্তার। অভিযোগে তাঁর মেয়ের শাশুড়িসহ তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
সিফাতুনের বাবা মো. নুরের দাবি, মারধরের ঘটনার পর বিষয়টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তাঁর মেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন বলে প্রচার করা হয়েছিল। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হক জানান, গত ১৪ অক্টোবর ওই গৃহবধূকে মারধরের একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলেও তিনি জেনেছেন। ঘটনার মূল বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ওসি জানিয়েছেন।
মাত্র পাঁচ মাস আগে বিয়ে হওয়া তরুণ এক গৃহবধূর এমন মৃত্যুতে এলাকায় শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। নাস্তার মতো তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বিরোধ থেকে মারধর, এবং তার জেরে একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর মৃত্যু — ঘটনাটি পারিবারিক নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র আবার সামনে এনেছে।
এখন পরিবারটির অপেক্ষা তদন্তের ফলাফলের দিকে। মারধরের অভিযোগ, হাসপাতালের চিকিৎসা নথি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য মিলিয়ে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনই হবে ন্যায়বিচারের প্রথম ধাপ — এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।






