পশ্চিম তীরে পূর্ণ অবরোধ: অন্তত ১৫ শহরে ইসরায়েলি অভিযান, আটক কয়েক ডজন ফিলিস্তিনি
অধিকৃত পশ্চিম তীরে পূর্ণ অবরোধ ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অন্তত ১৫টি শহর ও জনপদে অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। এসব অভিযানে কয়েক ডজন ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে। হেবরনে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পশ্চিম তীর পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ দিলে এই অভিযান শুরু হয়।
শনিবারের অভিযানগুলো মূলত উত্তর পশ্চিম তীরের শহরগুলোতে চালানো হয়। নাবলুস, জেনিন, তুবাস ও কালকিলিয়াসহ কয়েকটি বড় শহর ও আশপাশের জনপদে ঢুকে পড়ে ইসরায়েলি সেনারা। বিভিন্ন এলাকায় ঘরে ঘরে তল্লাশি চালানো হয় এবং বহু মানুষকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়।
নাবলুস এলাকায় জালুদ ও কারইউত গ্রামে ফিলিস্তিনিদের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়। জেনিনের কাছে আররাবেহ ও বুরকিন এলাকাতেও গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে তুবাস ও তার কাছের আক্কাবা শহরেও ঢুকে পড়ে ইসরায়েলি বাহিনী।
দক্ষিণ পশ্চিম তীরের হেবরনে পরিস্থিতি ছিল আরও কঠোর। সেখানে ইসরায়েলি বুলডোজার দিয়ে একটি তিনতলা ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ভবনটি ভাঙার আগে পরিবারগুলোকে নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়ার জন্য মাত্র পাঁচ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
হেবরনের এইন দেইর বাহহা এলাকা ও আশপাশে শত শত ফিলিস্তিনি পরিবারকে জোর করে বাড়িঘর ছেড়ে যেতে বলা হয়েছে। দুই সেনা নিহত হওয়ার হামলার এক সন্দেহভাজনের বাড়িও ঘিরে রাখে সেনারা, আর শহরের আল-জালদা মহল্লায় চালানো হয় অভিযান।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী শুক্রবার গভীর রাতে জানায়, হেবরনে তাদের অভিযান কয়েক দিন ধরে চলবে। এর পাশাপাশি পশ্চিম তীরের আরও কয়েক ডজন এলাকায় অন্য বাহিনীগুলোও অভিযান চালাচ্ছে বলে জানানো হয়। পূর্বদিকে জেরিকো শহর ও কাছের আকাবাত জাবর শরণার্থী শিবিরেও ঢুকে পড়ে ইসরায়েলি বাহিনী।
পূর্ণ অবরোধ কার্যকর হলে পশ্চিম তীরজুড়ে প্রায় এক হাজার চেকপয়েন্ট ও গেট বন্ধ হয়ে যাবে। এতে লাখ লাখ ফিলিস্তিনির দৈনন্দিন জীবন, যাতায়াত, চিকিৎসা ও কাজকর্ম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নেতানিয়াহু শুক্রবার এই অবরোধের নির্দেশ দেন। তার কিছুক্ষণ আগেই ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, তেলেম বসতির কাছে একটি রিজার্ভ ব্যাটালিয়নে হামলা চালানো দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীকে তারা হত্যা করেছে; ওই হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হন। ইসরায়েলের অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস জানিয়েছে, নিহত দুজনের পাশাপাশি অন্তত আরও তিন সেনা আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক আইনে তেলেমসহ সব ইসরায়েলি বসতি অবৈধ।
মঙ্গলবারের ইসরায়েলি নির্বাচনের আগে পশ্চিম তীরজুড়ে উত্তেজনা এমনিতেই চরমে ছিল। জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে ফসল তোলায় ব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারী ও সেনাদের হামলার ঘটনাও বেড়েছে বলে জানা গেছে। এই প্রেক্ষাপটেই নতুন করে বড় আকারের সামরিক অভিযান শুরু হলো।
হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির পশ্চিম তীরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইসরায়েলি সরকার ওই এলাকায় অসংখ্য বসতি নির্মাণে উৎসাহ দিয়ে আসছে।
ফিলিস্তিনি জাতীয় উদ্যোগ দলের মহাসচিব মুস্তাফা বারঘুতি বলেছেন, কট্টর ডানপন্থী ইসরায়েলি মন্ত্রীদের উসকানি পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে। তাঁর ভাষায়, এই অবরোধ প্রতিটি শহর ও গ্রামকে একটি ছোট কারাগারে পরিণত করেছে, যেখানে চেকপয়েন্ট ও গেট স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনীতি ও শিক্ষা—সবকিছু আটকে দিচ্ছে। এই সামষ্টিক শাস্তি শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরণ ডেকে আনবে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।
হেবরনে সেনাবাহিনীর ঘোষিত কয়েক দিনের অভিযান ও পশ্চিম তীরজুড়ে অবরোধ কত দিন চলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আটকদের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে, আর অবরোধ দীর্ঘ হলে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ আরও তীব্র হবে।





