ঢাকায় ব্রয়লার ১৯০, খামারির হাতে মাত্র ১৩৪: ডিমেও ডজনে ৫৩ টাকার ফারাক, লোকসানে প্রান্তিক খামারিরা
ঢাকার বাজারে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকায়, অথচ প্রান্তিক খামারি সেই মুরগি বিক্রি করছেন মাত্র ১৩৪ টাকা কেজি দরে। দুই পর্যায়ের দামে ব্যবধান কেজিতে ৫৬ টাকা। উৎপাদন খরচ মেটাতে না পেরে এক চালানেই প্রায় ৫০ হাজার টাকা লোকসানের কথা জানিয়েছেন এক খামারি।
ডিমের ক্ষেত্রেও চিত্র প্রায় একই। বুধবার (২১ অক্টোবর) ঢাকার বাজারে প্রতি ডজন লাল ডিম বিক্রি হয়েছে ১৫৫ টাকায়। অন্যদিকে প্রান্তিক খামারি আরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি প্রতি পিস ডিম বিক্রি করেছেন ৮ টাকা ৫০ পয়সা দরে — অর্থাৎ খামার পর্যায়ে প্রতি ডজন ডিমের দাম ১০২ টাকা। এখানে দুই পর্যায়ের ব্যবধান ডজনে ৫৩ টাকা।
খামারিদের অভিযোগ, মুরগির খাবার ও ওষুধের দাম বাড়লেও উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয়মূল্য সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের বাজারে দামের এই ব্যবধান, পোলট্রি খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং খামারিদের লোকসানের চিত্রে প্রশ্ন উঠছে — উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত বাজারব্যবস্থায় কোথায় তৈরি হচ্ছে এই চাপ।
প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হচ্ছে দুটি দিকে — ফিডের কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধিই কি সংকটের প্রধান কারণ, নাকি সরবরাহব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবও এই অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। খামারিদের হিসাব বলছে, খরচ বাড়ছে খামারের ভেতরে, কিন্তু বাড়তি দামের সুবিধা পৌঁছাচ্ছে না তাঁদের কাছে।
প্রান্তিক খামারি শাফিউর রহমান বলেন, ‘এই সপ্তাহে মুরগি বিক্রি করেছি ১৩৪ টাকা কেজি দরে। বর্তমানে উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। গত দুই মাসেই ব্রয়লার মুরগির খাবারের দাম বেড়েছে ২২৫ টাকা। বর্তমানে ৫০ কেজির একটি বস্তার দাম ৩ হাজার ৭৮৫ টাকা। ওষুধের দামও বেড়েছে।’
নিজের খামারের লোকসানের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, তিনি ১ হাজার ২০০ পিস মুরগি তুলেছিলেন। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার পিস বিক্রি করেছেন। এই চালানে তাঁর প্রায় ৫০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। বাকি মুরগির কিছু মারা গেছে, আর প্রায় ৭০ কেজি মুরগি এখনো খামারে রয়ে গেছে।
শাফিউর রহমানের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, মুরগির খাবার ও ওষুধের ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি বিক্রয়মূল্য উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে তাঁকে। একাধিক চালানে এমন লোকসান হলে খামারিদের চলতি মূলধন কমে যায়।
মূলধন কমে গেলে নতুন করে বাচ্চা তোলা, খাবার কেনা এবং খামারের কার্যক্রম চালিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ এক চালানের লোকসান শুধু ওই চালানেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা পরের উৎপাদনচক্রকেও চাপে ফেলে।
অন্যদিকে ঢাকার মুরগি ব্যবসায়ী আফজাল বলেন, ‘মুরগির দাম বাড়ে-কমে কাপ্তান বাজারের ওপর ভিত্তি করে। সেখানে সরবরাহ ভালো থাকলে মুরগির দাম কমে, আবার সরবরাহ কম থাকলে দাম বেড়ে যায়। সেখানে রাতে এক দামে মুরগি বিক্রি হয়, সকালে আরেক দামে।’ এই বক্তব্যে বোঝা যায়, রাজধানীর বাজারের দাম নির্ধারণে কেন্দ্রীয় পাইকারি বাজারের সরবরাহ পরিস্থিতি বড় ভূমিকা রাখে।
ব্রয়লার মুরগির মতো ডিম উৎপাদনেও বাড়তি ব্যয়ের চাপে রয়েছেন প্রান্তিক খামারিরা। লেয়ার ডিমের খামারি আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘আজ প্রতি পিস ডিম ৮ টাকা ৫০ পয়সায় বিক্রি করেছি। মুরগির খাবারের দাম বস্তাপ্রতি বেড়েছে ৩২৫ টাকা। এখন বাজারে বস্তার দাম ২ হাজার ৯০০ টাকার বেশি। ডিম বিক্রি করে খুব লাভ হয় না। চালান উঠে যায় আরকি।’
তাঁর দেওয়া দর অনুযায়ী, খামার পর্যায়ে প্রতি ডজন ডিমের বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ১০২ টাকা। অন্যদিকে বুধবার ঢাকার বাজারে লাল ফার্মের ডিম প্রতি ডজন বিক্রি হয়েছে ১৫৫ টাকায়। অর্থাৎ ভোক্তা যে দামে ডিম কিনছেন, তার একটি বড় অংশই খামারির কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে চিত্রটি দাঁড়াচ্ছে এমন — খামারে খরচ বাড়ছে খাবার ও ওষুধে, খুচরা বাজারে দাম বাড়ছে ভোক্তার জন্য, কিন্তু মাঝখানে খামারির প্রাপ্য দাম বাড়ছে না সেই অনুপাতে। ব্রয়লারে কেজিতে ৫৬ টাকা আর ডিমে ডজনে ৫৩ টাকার ব্যবধানই সেই চাপের সবচেয়ে স্পষ্ট হিসাব।
এই ব্যবধান টিকে থাকলে প্রান্তিক খামারিদের লোকসান ও মূলধন সংকট আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফিডের কাঁচামালের দাম, সরবরাহব্যবস্থা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা — কোনটি কতটা দায়ী, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই এখন বাজারব্যবস্থা বোঝার মূল চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে।





