একটি প্রীতি ম্যাচই শেষ করে দিল সভিলারের বেলজিয়াম স্বপ্ন: সিরি আ-র সেরা গোলকিপারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার আটকে এক ম্যাচে
ইউরোপের সেরা গোলকিপারদের একজন হয়েও আন্তর্জাতিক ফুটবলে মিলে সভিলারের ক্যারিয়ার আটকে আছে মাত্র একটি ম্যাচে। ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর হাঙ্গেরির দেব্রেচেনে কাতারের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে সার্বিয়ার হয়ে অভিষেকের সেই অর্ধেক ম্যাচই পাঁচ বছর পরও তাঁর একমাত্র আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয়ে আছে।
বিশ্বকাপের ঠিক ১৪ মাস আগে কাতারের প্রস্তুতি ম্যাচ ছিল সেটি। নিরপেক্ষ ভেন্যুতে সার্বিয়া জিতেছিল ৪-০ ব্যবধানে। বিরতির সময় প্রেদ্রাগ রাইকোভিচের জায়গায় নামেন ২২ বছর বয়সী সভিলার; সার্বিয়ার হয়ে সেটাই ছিল তাঁর অভিষেক।
সেই ম্যাচের পর বিশ্বকাপ বাছাইয়ের আরও চারটি ম্যাচের স্কোয়াডে ছিলেন সভিলার, কিন্তু মাঠে নামেননি একটিতেও। ২৭ বছর বয়সে এসে আজও সার্বিয়ার হয়ে তাঁর ম্যাচ ওই একটিই। অথচ গত মৌসুমে তিনি পেয়েছেন সিরি আ-র সেরা গোলকিপারের পুরস্কার, আর রোমার জার্সিতে এখন তিনি ইউরোপের সেরা কিপারদের একজন।
সভিলারের জন্ম ১৯৯৯ সালের আগস্টে বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্পে, বেড়ে ওঠাও সেখানেই। তাঁর বাবা রাতকো সভিলার ছিলেন সাবেক যুগোস্লাভিয়ার গোলকিপার, খেলেছেন ৯ ম্যাচ; ১৬ বছর রয়্যাল অ্যান্টওয়ার্পের গোলবারের নিচে কাটিয়ে ১৯৯৬ সালে পেশাদার ফুটবল ছাড়েন তিনি। ছেলের গল্প শুরু হয় বাবার ছায়া ধরে।
১০ বছর বয়সে বেয়ারশট থেকে ব্রাসেলসের আন্ডারলেখটে যান সভিলার। তারপর বেলজিয়ামের প্রতিটি যুব দল খেলেন অনূর্ধ্ব-১৫ থেকে। ২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান অনূর্ধ্ব-১৭ চ্যাম্পিয়নশিপে অসাধারণ খেলে সবার নজর কাড়েন। ২০১৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে আন্ডারলেখট ছেড়ে বেনফিকায় যান, সেখানেই সিনিয়র দলে প্রথম ম্যাচ খেলেন।
ওই অনূর্ধ্ব-১৭ আসরের সময় উয়েফা ডটকমকে সভিলার বলেছিলেন, বাবার কাছ থেকে তিনি অনেক শিখেছেন, প্রায় সবকিছুই; তাঁর খেলার ধরনও বাবার মতো। বাবার মতো খেলার সেই টান, রক্তের টান আর খেলাধুলার হিসাব মিলেই কয়েক বছর পর বাবার দেশকে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বাবাও উৎসাহ দিয়েছিলেন।
তবে বেলজিয়াম দলের দরজা তখনো পুরোপুরি বন্ধ ছিল না, আবার খোলাও ছিল না। গোলবারের নিচে তখন থিবো কোর্তোয়া, ২০২১ সালে যাঁর বয়স ২৯, গোলকিপার হিসেবে সবে সেরা সময়ে ঢুকছেন। সভিলার ও তাঁর বাবা সম্ভবত তখনই বুঝেছিলেন, মধ্য মেয়াদে বেলজিয়ামের এক নম্বর হওয়া ভীষণ কঠিন। বেলজিয়ামের সিনিয়র দলে ডাক পাননি সভিলার, যুব পর্যায়ে খেলেন ২৬টি ম্যাচ। ২২ বছর বয়সে সার্বিয়ার প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ফেডারেশন বদলান তিনি।
কিন্তু সার্বিয়ায় অপেক্ষা করছিল আরেক ধরনের দেয়াল। তখন রাইকোভিচ এক নম্বর, চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার জন্য তৈরি ভানিয়া মিলিঙ্কোভিচ-সাভিচ। পরের বছরগুলোয় সার্বিয়া মোটামুটি এ দুজনকেই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলিয়েছে। ফেডারেশন বদলের এত ঝক্কির পর সভিলার আশা করেছিলেন দ্রুতই মূল গোলকিপার হয়ে উঠবেন; তা হয়নি। তাই খুব তাড়াতাড়িই আফসোস শুরু হয়।
সার্বিয়ার হয়ে আর খেলতে চাননি সভিলার; ফিরতে চেয়েছেন বেলজিয়ামে। কিন্তু এখানেই দেয়াল তুলে দাঁড়ায় ফিফার বিধি। ‘ওয়ান-ওয়ে রুল’ বলে পরিচিত নিয়ম অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় ফেডারেশন বদলে নতুন দেশের হয়ে সিনিয়র পর্যায়ে একটি ম্যাচ খেললেই—সেটা প্রীতি ম্যাচ হোক বা প্রতিযোগিতামূলক—আগের দেশে আর ফিরতে পারেন না। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে কাতারের বিপক্ষে ঠিক সেটাই করেছিলেন সভিলার; বেলজিয়ামের হয়ে তাঁর আর খেলা হবে না।
তবু থামেননি রোমার এই গোলকিপার। ২০২২ সালে বেনফিকা থেকে ইতালিতে আসার পরও বছরের পর বছর ফিফার কাছে ছাড় চেয়েছেন তিনি। ২০২৪ সালের বসন্তে বেলজিয়ামের তৎকালীন কোচ দোমেনিকো তেদেস্কো বলেছিলেন, তাঁরা কয়েক মাস ধরে সভিলারকে অনুসরণ করছেন, কিন্তু এটা পরিষ্কার যে তিনি বেলজিয়ামের হয়ে খেলতে পারবেন না। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের আগেও নাকি আবার ফিফাকে রাজি করাতে চেয়েছিলেন সভিলার; আবারও খালি হাতে ফিরতে হয়েছে।
সবচেয়ে নিষ্ঠুর দৃশ্যটা সম্ভবত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। স্পেনের বিপক্ষে চোট নিয়ে মাঠ ছাড়েন কোর্তোয়া, ৭১ মিনিটে তাঁর জায়গায় নামেন সেনে লামেন্স। ম্যাচের শেষ দিকে লামেন্সের ভুলেই পরে চ্যাম্পিয়ন হওয়া স্পেন ২-১ গোলে এগিয়ে যায়। সমর্থকদের অনেকেরই মনে হয়েছে, ওই ৭১ মিনিটে নামার কথা হয়তো সভিলারেরই ছিল।
গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রীষ্মের সর্বশেষ হতাশার পরও আশা ছাড়েননি সভিলার; বেলজিয়ামে ফেরার ইচ্ছাটা এখনো আছে। অথচ সার্বিয়ার হয়ে খেলার দরজা খোলা। সার্বিয়ার কোচ ভেলিয়াকো পাউনোভিচ বছরখানেক আগে টিভি অ্যারেনা স্পোর্টকে বলেছিলেন, তিনি সভিলারের সঙ্গে কথা বলেছেন; সভিলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, দলের হয়ে আর খেলবেন না। কোচ দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, তিনি বোঝাতে চেষ্টা করেছেন যে সভিলার গুরুত্বপূর্ণ এবং চাইলে জাতীয় দলে তাঁর জায়গা আছে। কোচ ডাকছেন, দরজা খোলা—তবু ফেরেন না সভিলার; কারণ যে দেশে তিনি ফিরতে চান, তার দরজা তালাবন্ধ।




