গাজীপুরে মাদ্রাসাছাত্রকে যৌন নিপীড়নের মামলা: শিক্ষক ও পরিচালক গ্রেপ্তার, তৃতীয় আসামি পলাতক
গাজীপুরে তৃতীয় শ্রেণির এক শিশু শিক্ষার্থীকে (৮) একাধিকবার যৌন নিপীড়নের অভিযোগে কওমি মাদ্রাসার এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই মামলায় ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মাদ্রাসার পরিচালককেও। শিশুটির পরিবারের দায়ের করা মামলায় মোট তিনজনকে আসামি করা হয়েছে; তৃতীয় আসামি পলাতক রয়েছেন। গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রব্বানী গ্রেপ্তারের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
ঘটনাটি ঘটেছে গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানাধীন কলমেশ্বর (ডেঙ্গুর আলী সড়ক) এলাকার দারুল হেদায়া কওমি মাদ্রাসায়—মামলার এজাহারে এমনটাই উল্লেখ করা হয়েছে। শিশুটি ওই মাদ্রাসার আবাসিক বোর্ডিংয়ে থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত।
মামলার আসামিরা হলেন সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্য ধলডোর (বাগবাটি) এলাকার আব্দুল কুদ্দুস শেখের ছেলে ও মাদ্রাসার শিক্ষক অলিউল্লাহ ইসলাম (২৩), গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানাধীন শরীফপুর এলাকার লাল মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ মিজান (৩৮) এবং সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্য ধলডোর (বাগবাটি) এলাকার হারান শেখের ছেলে আব্দুল কুদ্দুস শেখ (৪৫)। এজাহারে মাদ্রাসার অপর একজনসহ পরিচালকের বিরুদ্ধে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
গ্রেপ্তার হয়েছেন প্রধান আসামি অলিউল্লাহ ইসলাম এবং মোহাম্মদ মিজান। তাঁদের মধ্যে অলিউল্লাহ ইসলাম ওই মাদ্রাসার শিক্ষক এবং মোহাম্মদ মিজান মাদ্রাসার পরিচালক। প্রধান আসামিকে ঢাকার বাইরে থেকে এবং পরিচালককে ঢাকার আশপাশ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দুজনকেই আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এজাহারে পরিবার উল্লেখ করেছে, গত ৭ অক্টোবর বিকেল ৪টার দিকে শিশুটিকে মাদ্রাসার বোর্ডিংয়ে রেখে আসা হয়। ১৩ অক্টোবর দুপুর ২টার দিকে ছেলেটি দুপুরের খাবার খেতে বাসায় আসে। সেদিন গোসল করানোর সময় শিশুটি শারীরিক যন্ত্রণার কথা জানালে প্রশ্নের মুখে সে মাকে ঘটনার কথা খুলে বলে।
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর রাতে ঘুমন্ত শিশুটিকে জাগিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে মাদ্রাসার স্টোররুমে নিয়ে যৌন নিপীড়ন করা হয়। এরপর ১১ অক্টোবর গভীর রাতে এবং ১২ অক্টোবর রাতে একই জায়গায় আবারও নিপীড়নের ঘটনা ঘটে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কথা মাকে জানালে মেরে ফেলার ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ করেছে পরিবার।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার কথা জানতে পরিবার তাৎক্ষণিকভাবে মাদ্রাসায় গিয়ে পরিচালক মোহাম্মদ মিজানকে বিষয়টি জানালে তিনি তালবাহানামূলক কথা বলেন। অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিচার-শালিশ বা আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং একপর্যায়ে অভিযুক্তকে কৌশলে মাদ্রাসা থেকে বের করে দেন। পরে অপর আসামি কুদ্দুস শেখকে ঘটনার বিষয়ে জানালে তিনিও ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং পরিবারকে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখান বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে।
পরিবারের এজাহারে আরও একটি গুরুতর তথ্য উঠে এসেছে—শিশুটির ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর একই মাদ্রাসায় পড়ুয়া আরেক শিশু শিক্ষার্থীকেও (১০) প্রধান আসামি শিক্ষক একাধিকবার যৌন নিপীড়ন করেছেন বলে জানা গেছে। ফলে ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) গাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম রব্বানী বলেন, শিশু শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগের মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনজনের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। গ্রেপ্তার দুজনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। পলাতক আব্দুল কুদ্দুস শেখকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে। বোর্ডিংয়ে থাকা শিশুদের সুরক্ষা, অভিযোগ জানানোর পথ এবং কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি—এসব বিষয়ে কঠোর নজরদারির দাবি দীর্ঘদিনের। এবারের ঘটনায় অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্ঠানের ভেতর থেকেই ঘটনা চাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে—যা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর আস্থাকে আরও নাড়িয়ে দিয়েছে।
পুলিশ বলছে, পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি মামলার তদন্তে অন্য কোনো শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হবে। গ্রেপ্তার দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এখন সবার নজর তদন্তের অগ্রগতি ও পলাতক আসামির গ্রেপ্তারের দিকে। ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে, আর এলাকাজুড়ে ঘটনাটি নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।



